শনিবার ২১শে জুলাই ২০১৮ রাত ১২:২০:৫০

Print Friendly and PDF

মারা গেছে অনাগত সন্তান, ঝুঁকিতে মাযমজ বাচ্চার একটি গর্ভে রেখেই সেলাই


জেলা সংবাদদাতা:

প্রকাশিত : বুধবার ২৫শে অক্টোবর ২০১৭ সকাল ০৯:৪৭:০৪, আপডেট : শনিবার ২১শে জুলাই ২০১৮ রাত ১২:২০:৫০,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ৭০৬ বার

গর্ভের যমজ সন্তানের একটি পৃথিবীর আলো দেখলেও আরেকটি মৃত অবস্থায় পেটে বয়ে বেড়াচ্ছেন খাদিজা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সময়নিউজ ডট নেট:
কুমিল্লা: গৃহবধূ খাদিজা আক্তারের (২০) কোলে হাসছে এক মাসের ফুটফুটে কন্যাসন্তান আদিবা ইসলাম। অথচ গর্ভে আদিবার সঙ্গে বেড়ে ওঠা যমজ সন্তানের আরেকটি এখনো মৃত অবস্থায় গর্ভেই বয়ে বেড়াচ্ছেন খাদিজা।

চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের সময় যমজ সন্তানের একটি বের করে আরেকটি ভেতরে রেখেই সেলাই করে দিয়েছিলেন। আর তাতেই গর্ভে মারা যায় শিশুটি। এমনকি গর্ভে থাকা ওই শিশুকে টিউমার বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন চিকিৎসক। অথচ আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে দুটি সন্তানের কথাই উল্লেখ ছিল।

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুরে ‘লাইফ ডিজিটাল হাসপাতাল’ নামের ক্লিনিকে ঘটেছে চিকিৎসকদের অদক্ষতা ও চরম অবহেলার এ ঘটনা।

গত মাসের ওই ঘটনার এক মাস পর খাদিজাকে আরেক ক্লিনিকে নিয়ে গেলে সেখানে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে চিকিৎসক জানান, খাদিজার পেটে টিউমার নয়, আরেকটি মৃত বাচ্চা আছে।

গত শনিবার এ ঘটনা ধরা পড়লে ধামাচাপা দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে লাইফ ডিজিটাল হাসপাতালের অভিযুক্তরা। ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই গত রবিবার গোপনে ওই প্রসূতিকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

আজ বুধবার ঢাকা মেডিক্যালে অস্ত্রোপচার করে খাদিজার গর্ভের মৃত সন্তান বের করার কথা রয়েছে।

তবে খাদিজা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন বলে আশঙ্কা করছেন সেখানকার চিকিৎসকরা।

এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ায় এরই মধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। কেননা ক্লিনিকের অভিযুক্ত দুই চিকিৎসকের একজন ডা. হোসনেয়ারা বেগম মালিগাঁও সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। এরই মধ্যে তাঁকে কারণ দর্শানো (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থলে গেলে লাইফ ডিজিটাল হাসপাতালের লোকজন সটকে পড়ে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২১২ নম্বর গাইনি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন গৃহবধূ খাদিজা। তাঁর মা আমেনা বেগম জানান, তাঁদের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায়। এক বছর আগে একই উপজেলার দুলালাপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের ওমানপ্রবাসী আবদুল আউয়ালের সঙ্গে খাদিজার বিয়ে হয়। বিয়ের পর খাদিজা অন্তঃসত্ত্বা হলে গত সেপ্টেম্বর মাসে তাঁকে পাশের দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুরের লাইফ ডিজিটাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁর সিজার করতে বলেন।

আমেনা জানান, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ওই ক্লিনিকে ডা. হোসনেয়ারা ও ডা. মঞ্জুরুল ইসলাম খাদিজার অস্ত্রোপচার করেন। তখন একটি কন্যাসন্তান প্রসব করেন খাদিজা। প্রসূতিকে অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে বের করার পরও তাঁর পেট ফোলা দেখে স্বজনরা ডা. হোসনেয়ারার কাছে জানতে চান। তখন ওই চিকিৎসক জানান, খাদিজার পেটে একটি টিউমার আছে। সুস্থ হওয়ার পর ঢাকা নিয়ে অস্ত্রোপচার করতে বলেন ডা. হোসনেয়ারা। পরে খাদিজা জানতে চাইলেও একই কথা বলেন ওই চিকিৎসক।

আমেনা বেগম আরো বলেন, সন্তান প্রসবের দুই দিন পর খাদিজাকে ছাড়পত্র দেয় ওই হাসপাতাল। তবে বাড়ি যাওয়ার দুই সপ্তাহ পর তাঁর পেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। গত শনিবার খাদিজাকে তাঁর মা হোমনা ডক্টর ক্লিনিকে ডা. লোকমান হোসেনের কাছে নিয়ে যান। সেখানে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে চিকিৎসক বলেন, খাদিজার পেটে টিউমার নয়; আরো একটি বাচ্চা রয়েছে। সেই বাচ্চা মারা গিয়ে পচন ধরেছে। হোমনার ডা. লোকমান বিষয়টি দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে জানান। এরপর ঘটনাটি জানাজানি হয়।

গতকাল ঢাকা মেডিক্যালে গিয়ে দেখা গেছে, খাদিজার পাশেই রয়েছে এক মাসের কন্যাসন্তান আদিবা ইসলাম। শিশুটি সুস্থই আছে।

জানা গেছে, হাসপাতালের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক নিলুফার অধীনে চিকিৎসাধীন খাদিজা। দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিৎসক জানিয়েছেন, আজ খাদিজার অস্ত্রোপচার হবে।

ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইলে ডা. হোসনেয়ারা বেগমও স্বীকার করেন, খাদিজা যে কাগজপত্র নিয়ে তাঁর কাছে গিয়েছিলেন সেখানকার আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে যমজ বাচ্চাই লেখা ছিল। তবে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন অপারেশন করি তখন প্রসূতির জরায়ুতে একটি বাচ্চা পাই। জরায়ুর বাইরে যে বাচ্চাটি ছিল তা চিকিৎসার ভাষায় টিউমার মনে করেছি। তাই রোগীর স্বাজনদের বলেছি পরে অপারেশন করে নিতে। ’

শোকজের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুনেছি আমার বস বিষয়টি জানার জন্য আমাকে চিঠি দিয়েছেন। ’

দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জালাল হোসেন বলেন, ‘ওই ডাক্তারকে (হোসনেয়ারা) শোকজ করা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করার জন্য আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাহিনুর আলম সুমনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ’

এদিকে অভিযুক্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গতকাল ওই হাসপাতালে তদন্ত কমিটি গিয়ে দায়িত্বশীল কাউকে পায়নি। তারা সবাই গাঢাকা দিয়েছে বলে জানা গেছে।