বৃহঃস্পতিবার ২৩শে নভেম্বর ২০১৭ সকাল ০৭:৫৫:৫৪

Print Friendly and PDF

মোবাইল-টিভি-ফ্রিজ-এসি’ কোনটা দেশি?ওয়ালটন দেশি পণ্য কিভাবে? পর্ব-১


বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত : শনিবার ২৯শে এপ্রিল ২০১৭ সন্ধ্যা ০৭:৫০:৩০, আপডেট : বৃহঃস্পতিবার ২৩শে নভেম্বর ২০১৭ সকাল ০৭:৫৫:৫৪,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ১২১৩৫ বার

ঢাকা: বিদেশি যন্ত্রাংশ আমদানী করে সেগুলো দেশে সংযোজনের পর ‘আমাদের পণ্য’ শ্লোগান দিয়ে বাজারজাত করছে দেশিয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। চায়না,  থাইল্যান্ড ও তাইওয়ান থেকে আর. বি. গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওয়ালটনের আমদানী করা যন্ত্রাংশের অধিকাংশই মানহীন। ‘দেশি’ সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে আমদানি করা নিম্নমানের এসব পণ্যকে দেশি বলে বছরের পর বছর দেদার ব্যবসা করে অর্থ-বিত্তে ফুলে ফেঁপে উঠেছে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা। যেন তদারকির কেউ নেই।  
 
জানা গেছে, আর বি গ্রুপের এ প্রতিষ্ঠানটি মূলত চায়না, তাইওয়ান এবং থাইল্যান্ড থেকে তৈরি দ্রব্য সামগ্রী (ফিনিশড গুড) এনে বাংলাদেশে সংযোজন (অ্যাসেম্বল) করে দেশিয় পণ্য বলে বিক্রি করছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি একদিকে মোটা অংকের কর ফাঁকি দিচ্ছে, অপরদিকে প্রতারণা করছে ক্রেতা সাধারনের সাথে। আর এটা করতে গিয়ে তারা দেশিয় গণমাধ্যমগুলোতে উচ্চমূল্যে বিজ্ঞাপণ দেয়াসহ কেউ তাদের বিরুদ্ধে যাতে  মুখ না খোলে সেজন্য নানা ফন্দি ফিকির করে চলেছে। এজন্য সেক্টর ভিত্তিক লোক নিয়োগ দিয়ে দ্বায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বাংলাদেশে মূলত কোন পণ্য তৈরির প্রযুক্তি এখনো উদ্ভাবিত হয়নি। ওয়ালটন কোন যন্ত্রাংশ তৈরি (ম্যানুফ্যাকচারিং) করে না বা করার প্রযুক্তি নেই। নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যায়ের এক প্রকৌশলী বলেন, ওয়ালটন দেশের বাইরে থেকে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ কিনে সেগুলোকে দেশে এনে সাজাচ্ছে। ফলে ভালো সার্ভিস পাচ্ছেন না ক্রেতারা। তিনি বলেন, ওয়ালটন কখনোই ক্রেতাবান্ধব হতে পারে না। কারণ, তারা ভালো পণ্যের যোগান দেয়ার চেয়ে কম মূল্যে বাজারে পণ্য সরবরাহের বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ থেকেই বোঝা যায়, ওয়ালটনের মূল লক্ষ্য কমমূল্যে নিম্নমানের পণ্য দিয়ে দেশীয় বাজার দখল করা। ওয়ালটনে দক্ষ কর্মীর অভাবের কথা উল্লেখ করে ওই প্রকৌশলী আরও বলেন, একেতো নিম্নমানের পণ্য তার ওপর সেগুলোকে অদক্ষ কর্মীর সাহায্যে সংযোজনের কাজটি করা হয়। এ কারণেই কয়েকদিনের মাথায় প্রযুক্তিপণ্যগুলো বিগড়ে যায়।

ওয়ালটনের সাবেক এক প্রকোশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওয়ালটন সাধারণত চায়না, থাইল্যান্ড এবং তাইওয়ান থেকে যন্ত্রাংশ আমদানি করে। তারপর সেগুলোকে দেশে সংযোজন করে। তিনি আরো বলেন, ওয়ালটন মোটরসাইকেলে মাইলেজের কথা বলা হয়েছে ৫৫-৬০কি.মি. প্রতি ঘন্টা কিন্তু আদতে মোটরসাইকেলগুলির মাইলেজ ৪০-৪৫কি.মি.। নিম্নমানের পণ্যদিয়ে তৈরি ফ্রিজের অবস্থাও ভালো না। প্রতিদিনই সার্ভিস সেন্টারগুলোতে আসে অসংখ্য অভিযোগ।

মোহাম্মদপুর শেখেরটেক-১২ নম্বরের বাসিন্দা ভুক্তভোগি মো. শাহাদাত হোসেন ফার্মগেটের শোরুম থেকে ওয়ালটন ডিপফ্রিজ কিনেছিলেন। শাহাদাত বলেন, ২০১৬ সালের শুরুর দিকে ফ্রিজটি কিনি। কিছুদিন পরই দেখি ফ্রিজের খাবারগুলো পঁচে যাচ্ছে। ফ্রিজ ঠিকমতো কাজ করছে না। এ নিয়ে কোম্পানিটির সার্ভিস সেন্টারে যোগাযোগ করি। তারা ফ্রিজ কেনার সময় বলেছিল যে, দুই বছরের মধ্যে ফ্রিজে কোনো সমস্যা হলে বদল করে দেবে। কিন্তু তাদের সার্ভিসে আমি পুরোপুরি হতাশ। বেশ কয়েকবার ফোন করার পরেও তাদের কোনো রকম সহায়তা পাইনি। এরপর যখন তারা এলো, ফ্রিজ না বদলে মোটামুটি একটু মেরামত করে দেয়। কিন্তু এতেও শেষ রক্ষা হয়নি। কয়েকদিনের মধ্যে ফ্রিজটি আবারো নষ্ট হয়ে যায় । এখন ফ্রিজটি পুরোপুরি ব্যবহার অযোগ্য।

দেশীয় পণ্য বিক্রির নামে ওয়ালটনের তৈরি নিম্নমানের পণ্যগুলোর প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ স্ট্যন্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) অনুমোদন নেই। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএসটিআই’র উপ-পরিচালক নুরুল ইসলাম বলেন, ওয়ালটনের প্রধান পণ্য ফ্রিজ এবং এসি বিএসটিআই’র কোন ধরণের অনুমোদনপ্রাপ্ত পণ্য নয়। ওয়ালটন যে দেশের বাইরে থেকে যন্ত্রাংশ এনে সংযোজন করে দেশীয় পণ্য হিসেবে বিক্রি করছে, এ ব্যাপারে নুরুল ইসলাম বলেন, এটা আসলে আমাদের বিষয় নয়।

জানা গেছে, ওয়ালটন মোটরসাইকেলের পুরো ইঞ্জিন দেশের বাইরের। ফ্রিজের ক্ষেত্রে কম্প্রেসার বাইরের, ওয়ালটন শুধু বডি তৈরি করেই দাবি করছে দেশীয় পণ্য হিসেবে। দেশি পণ্য হিসেবে ওয়ালটনের যে এনড্রয়েড মোবাইল ফোন বাজারে রয়েছে তাও দেশি নয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিজস্ব প্রযুক্তি এবং পণ্য ব্যবহার করে এনড্রয়েড মোবাইল ফোন তৈরি করার প্রযুক্তি বাংলাদেশে নেই। বিদেশ থেকে ক্রয় মূল্যের সমপরিমান আমদানি খরচ মিটিয়ে যে মোটরসাইকেল বাংলাদেশে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়, সেই একই মানের মোটরসাইকেল ওয়ালটনও বিক্রি করে একই দামে। ওয়ালটন যদি দেশি পণ্যই হবে তাহলে তাদের তো ক্রয় মূল্যের সমপরিমান আমদানি খরচ নাই। তারা ওই একই মোটরসাইকেল কেন ৪৫ কিংবা ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করছে না? এমন প্রশ্ন করেছেন ক্রেতাদের অনেকেই।

ওয়ালটনে কর্মরত আরেক প্রকৌশলী (চাকরিতে বঞ্চনা থেকে ক্ষুব্ধ) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওয়ালটন দেশিয় পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ আমদানি করে থাকে কোনো ধরনের শুল্ক ছাড়াই। সেক্ষেত্রে চাইলেই প্রতিষ্ঠানটি লাভের মার্জিন কমরেখে আরো কমমূল্যে তাদের সামগ্রী বিক্রি করতে পারে। ওই প্রকৌশলী ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, ওয়ালটন প্রতিবছর চাকরি প্রদানের ক্ষেত্রে নতুন প্রকৌশলীদের প্রথমেই পাঁচ বছরের জন্য বন্ড সাক্ষর করায়, যা একেবারেই নীতি পরিপন্থী।

এ বিষয়ে ওয়ালটনের ম্যানেজার (মিডিয়া) এনায়েত ফেরদৌসের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে ফোনে কিছু বলতে পারবো না আপনি সামনা-সামনি কথা বলেন। ওয়ালটনের পণ্যগুলো দেশি না বিদেশি-এমন প্রশ্নের উত্তর তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান। একপর্যায়ে তিনি কোন উত্তর না দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তিতে বেশ কয়েকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

সময়নিউজ ডট নেট//সাফায়েত