সোমবার ২২শে জানুয়ারী ২০১৮ রাত ১০:০৫:৪৮

Print Friendly and PDF

‘ফাঁদ মামলা’ করে ঘুষের লাগাম টানতে চায় দুদক


বিশেষ প্রতিনিধি:

প্রকাশিত : বৃহঃস্পতিবার ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৭ সকাল ১০:২৫:৫৩, আপডেট : সোমবার ২২শে জানুয়ারী ২০১৮ রাত ১০:০৫:৪৮,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৬৩ বার

সময়নিউজ ডট নেট:
ঢাকা: দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অন্যতম এজেন্ডা ‘ফাঁদ মামলা’। ফাঁদ মামলা করেই দুদক ‘ঘুষের লাগাম’ টানতে চায়। এজন্য দুদক চেয়ারম্যান সবার প্রতি ঘুষ প্রদানের আগেই ঘুষ গ্রহণকারীর বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগের অনুরোধ জানিয়েছেন। এদিকে ২০১৪ সাল থেকে কচ্ছপ গতিতে চলতে থাকা ফাঁদ মামলার কার্যক্রম গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত প্রায় চার বছরে মোট ৩৭টি ফাঁদ মামলার মধ্যে ২৯টি মামলাই গত এক বছরে দায়ের করা হয়েছে। দুদকের ফাঁদ মামলার কার্যক্রম এই হারে বৃদ্ধি পাওয়াকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তাদের মতে, ঘুষের লাগাম টানতে চাইলে ঘুষখোরদের গ্রেফতারের ক্ষেত্রে আরও নজির সৃষ্টি করতে হবে। একইসঙ্গে ঘুষখোরদের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুদকে ঘুষখোরদের বিষয়ে তথ্য প্রদানকারীদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, দুদক নিজে কোনো ফাঁদ পেতে মামলা করে না। যখন কোনো সেবা প্রদানকারী কর্মকর্তা ঘুষ দাবি করে, আর যদি সেবা গ্রহণকারী ব্যক্তি দুদকে অভিযোগ করে, তখন ঘুষখোর ওই কর্মকর্তাকে হাতেনাতে গ্রেফতারের জন্য আইন অনুযায়ী ফাঁদ মামলা অভিযান পরিচালনা করা হয়। সবার কাছে অনুরোধ- ঘুষ প্রদানের আগেই ঘুষ গ্রহণকারীর বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ করুন। তাহলেই ঘুষ-দুর্নীতি কমে আসবে। এজন্য সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে।

দুদকের মহাপরিচালক (লিগ্যাল অনুবিভাগ) মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার হওয়া ফাঁদ মামলাগুলোয় সাজা অনেকটা নিশ্চিত। কারণ একজন প্রকৃত সেবাগ্রহীতার সহায়তায় ফাঁদ মামলা করা হয়। আর সেবাগ্রহীতার সাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে আদালত আসামিকে সাজা দেন।

জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ফাঁদ মামলার মাধ্যমে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করা না গেলেও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তবে এক্ষেত্রে দুটো বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রথমত, যারা ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার হলেও তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যারা বাধ্য হয়ে ঘুষ প্রদান করেন অর্থাৎ দুদকে তথ্য প্রদানকারীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে- এ দুটো কাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলে ফাঁদ মামলা করতে সাধারণ মানুষ উৎসাহী হয়ে দুদকের কাছে তথ্য দেবে।

ফাঁদ মামলায় গতি ফিরেছে: ২০১৪ সালে ফাঁদ মামলা পরিচালনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও অজ্ঞাত কারণে সে কার্যক্রম দীর্ঘদিন কচ্ছপ গতিতে চলছিল। কমিশনের কঠোর নির্দেশে গত এক বছরে ফাঁদ মামলার কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে দুদক চেয়ারম্যান সংবাদ সম্মেলন করে সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের প্রতি ঘুষ গ্রহণ না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানান। ‘তা না হলে কঠিন পরিণতির জন্য অপেক্ষা করুন’- বলে হুশিয়ারি দেন। সেই সঙ্গে সরকারি দুর্নীতিপ্রবণ অফিসগুলোর কর্মকর্তাদের ফাঁদ পেতে গ্রেফতারের জন্য কমিশনের প্রতিটি কর্মকর্তার প্রতি কঠোর নির্দেশনা দেন। আর সেই নির্দেশনার পর থেকেই ফাঁদ মামলার সংখ্যা হুহু করে বাড়তে থাকে। দুদক চেয়ারম্যানের কঠোর নির্দেশে বর্তমানে ‘ফাঁদ মামলা’র সংখ্যা প্রায় অর্ধশতকের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। দুদক ও আদালত সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে দুদক ৫টি ফাঁদ মামলা দায়ের করে। আর ২০১৫ সালে ফাঁদ মামলা হয় তিনটি। এরপর ফাঁদ মামলার ওপর কমিশনের গুরুত্বারোপের ফলে পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে ১৩টি ফাঁদ মামলা হয়। এরই ধারাবাহিকতা চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যান্ত ঘুষের টাকাসহ দুর্নীতিবাজদের গ্রেফতার করে মোট ১৬টি ফাঁদ মামলা করা হয়েছে। আর গত এক বছরে (২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) ২৯টি ফাঁদ মামলা হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ফাঁদ মামলা: এক. চলতি বছরের ১৮ জুলাই ঘুষের পাঁচ লাখ টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার নৌ পরিবহন অধিদফতরের (বিআইডব্লিউটিএ) প্রধান প্রকৌশলী ও শিপ সার্ভেয়ার একেএম ফখরুল ইসলাম। মতিঝিল থানায় মামলা হয়। দুই. গত ১৩ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ‘ক’ অঞ্চল আদালতের বেঞ্চ সহকারী (পেশকার) মো. জাকির হোসেনকে এক লোকের কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণকালে হাতেনাতে গ্রেফতার করে দুদক। টাঙ্গাইল সদর থানায় মামলা হয়েছে। তিন. বিআরটিএ’র নরসিংদী কার্যালয়ের কর্মকর্তা সুমন কুমার সাহা ড্রাইভিং পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স দেয়ার কথা বলে ইয়াছিন আরাফাত নামের এক ব্যক্তির কাছে ২৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে দুদক তাকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে। নরসিংদী সদর থানায় মামলা হয়।