মঙ্গলবার ১৯শে জুন ২০১৮ রাত ০৯:৫৫:১২

Print Friendly and PDF

মালয়েশিয়ায় 'সেকেন্ড হোম প্রকল্প'১০৬৩ বাড়ি ক্রেতার তালিকা দুদকে


বিশেষ প্রতিনিধি:

প্রকাশিত : শুক্রবার ৬ই অক্টোবর ২০১৭ সকাল ১০:২২:০০, আপডেট : মঙ্গলবার ১৯শে জুন ২০১৮ রাত ০৯:৫৫:১২,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫৪২ বার

সময়নিউজ ডট নেট:
ঢাকা: সুযোগ-সুবিধা ও আয়ের উৎস গোপন রাখায় বিনিয়োগে বাংলাদেশি ধনাঢ্যদের প্রথম পছন্দের দেশ হয়ে উঠেছে মালয়েশিয়া। এ সুযোগে মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশি ধনাঢ্যদের বাড়ি কেনার সংখ্যাও ক্রমে বাড়ছে। এরই মধ্যে তিন হাজার ৫৪৬ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় আলিশান বাড়ি কিনেছেন। মালয়েশিয়ায় গত ১৫ বছরে বিভিম্ন দেশের ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ সেকেন্ড হোম কেনার সুযোগ পেয়েছেন, যার মধ্যে সাড়ে তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশি। সংখ্যার বিচারে এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়।

সেকেন্ড হোম কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করে যারা এসব বাড়ি কিনছেন, অনুসন্ধান করে এমন এক হাজার ৬৩ জনের তালিকা তৈরি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৬৪৮ জনের বিরুদ্ধে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। দুদকের অনুসন্ধানে ওই প্রকল্পে অনেকের বাড়ির ঠিকানাও পাওয়া গেছে।

দুদক সূত্র জানায়, অর্থ পাচার করে মালয়েশিয়ায় যারা সেকেন্ড হোম গড়ে তুলছেন তাদের মধ্যে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীরা রয়েছেন। আর অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মালয়েশিয়ায় বাড়ি কিনতে দেশ থেকে পাচার হয়েছে কমপক্ষে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। পাচার হওয়া এসব অর্থের সিংহভাগই অপ্রদর্শিত আয়ের অংশ বলে মনে করেন তারা।

এদিকে, আইনিভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের নামের তালিকা চেয়ে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে বেশ ক'বার চিঠি পাঠিয়েছে দুদক। কিন্তু তালিকা প্রদানে দেশটির ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে দুদকের উপপরিচালক জুলফিকার আলীর নেতৃত্বাধীন অনুসন্ধান টিমের সদস্যরা সরেজমিনে দেশটির সেকেন্ড হোম প্রকল্প পরিদর্শনে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

দুদক সচিব ড. মো. শামসুল আরেফিন বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। আমলযোগ্য আরও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির পরিচয় মুখ্য নয়, দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেশের অর্থনীতি ও উম্নয়নকে উপেক্ষা করে যারা বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। আর কমিশন যদি প্রয়োজন মনে করে, তবে অনুসন্ধান টিমকে অধিকতর অনুসন্ধান চালাতে মালয়েশিয়া পাঠাবে।

মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম প্রকল্পে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরাও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করছেন- এমন অভিযোগ উঠেছে। গত জুলাই মাসে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ তথ্য জানানো হয়। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রিহ্যাবের প্রথম সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া। তিনি বলেন, অর্থ পাচারের কারণে দেশের আবাসন ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এদিকে সম্প্রতি রাজধানী কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠেয় সেকেন্ড হোম কর্মসূচি নিয়ে জাতীয় কর্মশালায় মালয়েশিয়ার পর্যটন ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নাজরি আজিজ জানান, ২০০২ সালে 'মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম' (এমএম২এইচ) নামে বিশেষ কর্মসূচি চালুর পর এ পর্যন্ত ১২৬টি দেশের ৩৩ হাজার ৩০০ জন এ সুবিধা নিয়েছেন। এর মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে চীন; দেশটির আট হাজার ৭১৪ জন এ সুবিধা নিয়েছেন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জাপান; দেশটির চার হাজার ২২৫ জন এ সুবিধা নিয়েছেন। আর তৃতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশের তিন হাজার ৫৪৬ জন এ কর্মসূচির আওতায় বাড়ি কিনেছেন। এরপর যথাক্রমে যুক্তরাজ্য থেকে দুই হাজার ৪১২ জন, ইরান থেকে এক হাজার ৩৩৬ জন, সিঙ্গাপুর থেকে এক হাজার ২৯৫ জন, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এক হাজার ২৬৬ জন, তাইওয়ান থেকে এক হাজার ২০৮ জন, পাকিস্তান থেকে ৯৭৩ জন ও ভারতের ৮৯০ জন এ সুযোগ নিয়েছেন।

নাজরি আজিজ আরও জানান, সেকেন্ড হোম কর্মসূচির আওতায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা স্থাবর সুবিধা ও রাজস্ব হিসেবে মোট এক হাজার ২৮০ কোটি মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ করেছেন। এক লাখ ডলার জমা দেওয়াসহ বিশেষ কিছু শর্ত পূরণ করে যে কোনো দেশের নাগরিক মালয়েশিয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে বসবাসের সুযোগ পান। বিনিয়োগকারীদের আয়ের উৎস গোপন রাখে মালয়েশিয়া সরকার।

পাঁচ লাখ রিঙ্গিত বা এক কোটি ২২ লাখ টাকা জমা দেওয়ার পাশাপাশি মাসিক ১০ হাজার রিঙ্গিত বা দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা বৈদেশিক আয় দেখাতে পারলেই পাওয়া যায় মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোমে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ।

মালয়েশিয়া দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, যে কোনো দেশের নাগরিক মালয়েশিয়ার মাই সেকেন্ড হোম প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এ জন্য ফিক্সড ডিপোজিট হিসেবে পাঁচ লাখ রিঙ্গিত জমা রাখতে হয়। তবে দ্বিতীয় বছরে অর্ধেক অর্থ তুলে নিতে পারেন সুবিধা গ্রহণকারীরা।

গেল দুই বছর অর্থাৎ ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে সেকেন্ড হোম সুযোগ গ্রহণের মাত্রা ফের বেড়েছে। এর আগে ২০০৫, ২০০৬ ও ২০০৭ সালে চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময় ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সেকেন্ড হোম কেনার মাত্রা বেড়ে যায়।

মালয়েশিয়ার পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম প্রকল্পের সরকারি ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুসারে, ২০০৬ সালে বাংলাদেশিরা ছিলেন প্রথম স্থানে, ২০০৭ সালে চতুর্থ, ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ সালে ষষ্ঠ, ২০১১ সালে চার নম্বরে, ২০১২ সালে তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন বাংলাদেশিরা। এর পর থেকে তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান নিচে থাকলেও ২০১৪ থেকে সুবিধা গ্রহণের সুযোগ বেশি নিচ্ছেন বাংলাদেশিরা। এ প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় দেড়শ' বাংলাদেশি আবেদনকারী মালয়েশিয়ার নাগরিকত্ব গ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছেন। শিগগিরই তাদের প্রক্রিয়া শেষ হবে বলে জানিয়েছে মালয়েশিয়ার পর্যটন মন্ত্রণালয়।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধান টিমের সদস্যরা ওই প্রকল্প পরিদর্শনের সুযোগ পেলে সেখানকার বাংলাদেশিদের বাড়ির ঠিকানা, ক্রয়মূল্য, কখন ক্রয় করা হয়েছে, তাদের ব্যাংক হিসাব, ব্যাংক হিসাবে কোন চ্যানেলে টাকা জমা হয়েছে- এসবসহ অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করবেন। পরে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে অর্থ পাচারকারীদের তালিকা ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে।

দুদক সূত্র জানায়, যে এক হাজার ৬৩ জনের তালিকা পাওয়া গেছে তাতে দেশের প্রথম সারির সম্পদশালীদের নাম না থাকলেও মধ্যম ও উচ্চমধ্যম সারির ধনাঢ্যদের নাম রয়েছে। তারা নিজ দেশে বিনিয়োগ না করে বেআইনিভাবে দেশটিতে অর্থ পাচার করেছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের অভ্যন্তরে অনেকের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব থাকলেও অর্থ পাচার করে বিদেশে মিলেমিশে বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয়নি।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, অনুসন্ধানকালে দুদক মালয়েশিয়া যাতায়াতকারী ১০ হাজার ৯০৪ জনের তালিকা সংগ্রহ করেছে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) থেকে। এ তালিকা যাচাই-বাছাই করে অভিযুক্ত এক হাজার ৫০ জনকে চিহ্নিত করা হয়। আর অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত ১৩ জনের তালিকা সংগ্রহ করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। সব মিলিয়ে এক হাজার ৬৩ জনের তালিকা রয়েছে দুদকের হাতে। অর্থ পাচার করে মালয়েশিয়ায় বাড়ি কেনার অভিযোগটি অনুসন্ধান করা হচ্ছে চার বছর ধরে। বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৪৭ মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা এক সার্কুলার অনুযায়ী, দেশের বাইরে কোনো স্থাবর সম্পত্তি কেনার সুযোগ নেই।


বিশ্বের বিভিম্ন দেশের অর্থ পাচার নিয়ে জ্ঞ্নোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক গবেষণার বরাত দিয়ে দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০২-২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত ১২ বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত এক লাখ ২৮ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা (এক হাজার ৬০৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার) পাচার হয়েছে। বিশ্বের যে ১৫০টি উম্নয়নশীল দেশ থেকে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম। আর দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।

মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম কর্মসূচিতে যারা যেতে চান তাদের সহায়তা করতে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছেন একাধিক আইনজীবী। চলছে অনলাইনেও প্রচার। তাদের একজন অ্যাডভোকেট রায়হান উদ্দিন। তিনি বলেন, অধিকাংশ সেকেন্ড হোম গ্রহণকারী বিদেশি আত্মীয়দের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে থাকেন। সরকারিভাবে কোনো বৈধ চ্যানেলে সেকেন্ড হোম প্রকল্পে টাকা নেওয়ার সুযোগ না থাকায় অর্থ হুন্ডি হয়ে মালয়েশিয়ায় যায়।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভংকর সাহা বলেন, মালয়েশিয়ায় অবৈধ লেনদেন ঠেকাতে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সক্রিয় রয়েছে। তারা অনেক অভিযোগ পেয়েছেন। সেগুলো তদন্ত করে অর্থ পাচারের সত্যতাও মিলেছে। বিষয়গুলো দুর্নীতি দমন কমিশনকে অবহিত করা হয়েছে। অর্থ পাচার ঠেকাতে তারা মালয়েশিয়ার দূতাবাসের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন।