বুধবার ২৪শে জানুয়ারী ২০১৮ বিকাল ০৫:৫৭:০৬

Print Friendly and PDF

প্রধানমন্ত্রী নতুন কিছু ভাবলে সংলাপের উদ্যোগ নেয়া উচিত: বিএনপি


নিজস্ব প্রতিবেদক:

প্রকাশিত : শনিবার ১৩ই জানুয়ারী ২০১৮ রাত ০৮:৪২:৫৭, আপডেট : বুধবার ২৪শে জানুয়ারী ২০১৮ বিকাল ০৫:৫৭:০৬,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯৯ বার

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ নিয়ে বিএনপির প্রতিক্রিয়া জানাতে শনিবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল—ফোকাস বাংলা

জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ একাদশ সংসদ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিদ্যমান সঙ্কটকে আরও ঘনীভূত করে তুলেছে বলে জানিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে দলটি বলেছে, প্রধানমন্ত্রী 'নির্বাচনকালীন সরকার' নিয়ে নতুন কিছু ভেবে থাকলে এ নিয়ে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে শনিবার বিকেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির পক্ষ থেকে এসব কথা বলা হয়। রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

টানা দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে শনিবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ভোটের আগে 'নির্বাচনকালীন সরকার' গঠন নিয়ে ভাষণে তিনি বলেছেন, 'সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষদিকে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কীভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা আমাদের সংবিধানে সম্পূর্ণভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বতোভাবে নির্বাচন কমিশনারকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে।'

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে উল্লেখিত প্রতিটি বিষয়ের ওপর আলাদাভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। এসময় দেশের জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, মানুষের আয়-ব্যয় বৈষম্য, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অবস্থা, শিক্ষা, সরকারের মেগা প্রকল্প, বিদেশে অর্থ পাচার, বিগত দিনে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংস ঘটনাসহ একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দলের বক্তব্য তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব।

মির্জা ফখরুল বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য নির্বাচনকে ঘিরে বিদ্যমান সঙ্কটকে আরও ঘনীভূত করে তুলেছে। সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে স্পষ্ট কোন বিধান নেই। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী যদি সংসদ বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাহলে সেই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। কারণ সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচনকালীন সরকারও হবে বিদ্যমান সরকারেরই অনুরূপ। সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার কেবল রুটিন ওয়ার্ক করবে—এমন কিছু উল্লেখ নেই।

সংবিধানের ১৫তম ও ১৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শাসনকে পাকাপোক্ত করার একটি ব্যবস্থাই করা হয়েছে মাত্র। সংবিধান ও গণতন্ত্র সবসময় সমার্থক বা সমান্তরাল হয় না। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি আন্তরিকভাবে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে নতুন কিছু ভেবে থাকেন তা হলে তার উচিত হবে এ নিয়ে সকল স্টেক-হোল্ডারদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেয়া।'

তিনি আরও বলেন, 'আমাদের দল মনে করে একটি আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে ২০১৮'র নির্বাচন সম্পর্কে অর্থবহ সমাধানে আসা সম্ভব। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আমাদের দলের একটি চিন্তা-ভাবনা আছে। একটি সুন্দর পরিবেশে সংলাপটি অনুষ্ঠিত হলে জাতির মনে যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আমরা আস্থা রাখতে চাই।'

লিখিত বক্তব্যের শুরুতেই বিএনপি মহাসচিব বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ জাতিকে হতাশ, বিস্ময়-বিমূঢ় এবং উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই ভাষণে বিদ্যমান জাতীয় সঙ্কট নিরসনে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা নেই। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তা খুবই অস্পষ্ট, ধোঁয়াশাপূর্ণ, এবং বিভ্রান্তিকর। জাতি আশা করেছিল প্রধানমন্ত্রিত্বের এই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার এক বছর আগেই তিনি যে ভাষণ দেবেন সে ভাষণে থাকবে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা, জাতীয় সঙ্কট নিরসনে একটি স্পষ্ট রূপরেখা। আর জনগণের উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য থাকবে বিভ্রান্তির বেড়াজালমুক্ত কর্ম পদক্ষেপ।'

বর্তমান সরকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের উন্নয়নের বয়ানকে দৃশ্যমান করার জন্য কোশেস করছে—এমন অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, 'মেগা-প্রকল্পগুলো নিয়ে গণমাধ্যম ইতোমধ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করছে। এ সব প্রকল্পের ব্যয় অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি। সঠিক সময়ে প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়িত না হওয়ায় একাধিকবার প্রকল্প-ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী সংশোধন করতে হচ্ছে। ফলে এ সব প্রকল্প থেকে কাঙ্খিত কল্যাণ সুদূরপরাহত হয়ে পড়েছে।'

বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছে—এ কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, 'মার্চ ২০১৭ শেষে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৭৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের মোট ঋণের ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০১৬ মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। আর এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে আরও ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। যার মাধ্যমে এসব মন্দঋণ আর্থিক প্রতিবেদন থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এসব কারণে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। হিসাবটি আঁতকে ওঠার মতো।'

তিনি বলেন, 'ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার বেইল আউট প্রোগ্রামের আশ্রয় নিয়েছে। বেইল আউট প্রোগ্রামের ফলে বাড়তি করের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকিং সেক্টরের লুটপাট থেকে লাভবান হচ্ছে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি।'

এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, '২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মাত্র ৭ বছরে দেশের ৭ লক্ষ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছরে গড়ে বিদেশে টাকা পাচার হয় ৮১ হাজার কোটি টাকা। শুধু ২০১৫ সালেই বিদেশে পাচার হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা; যা খুবই উদ্বেগজনক। ২০১১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিরা ১ হাজার ২২২ কোটি টাকা জমা করে। আর ২০১৫ সালে জমা করে ৪ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। আর ৪ বছরে জমাকৃত টাকার পরিমাণ ৪ গুণ বেড়ে যায়।'

মির্জা ফখরুল বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে তার শাসনামলে উন্নয়নের এক চোখ ধাঁধাঁনো বয়ান পেশ করেছেন। বিশেষ করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে তাদের দাবির সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানও একমত হতে পারেনি। গত বছরের জানুয়ারিতে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেকটাসে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি হবে না। অথচ অর্থমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, এই প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে হবে না। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে বিশ্বব্যাংক মনে করে। অথচ সরকার এ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে।'

এভাবে প্রায় প্রতি বছরই প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত সরকারি প্রাক্কলনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলো দ্বিমত পোষণ করে আসছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে 'আগুন সন্ত্রাসে' নিহতদের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, 'গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে জনগণের সামনে হেয় করার জন্য তা ছিল এক সরকারি অপচেষ্টা; যা ওই সময়ে বিভিন্ন সামাজিক ও গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়েছে।'

এসময়ে মির্জা ফখরুল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নানা দিক তুলে ধরে বলেন, 'গত ১০ বছরে কমপক্ষে ৭৫০ জন গণতন্ত্রকামী কর্মীকে গুম করেছে সরকারি বাহিনী। অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবলমাত্র ২০১৭ সালে সরকারি বাহিনী কর্তৃক গুমের শিকার ৮৬ জন। তাদের মধ্যে ৯ জনের লাশ পাওয়া গেছে। ৪৫ জনকে গুম পরবর্তী আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। ১৬ জনকে ছেড়ে দিয়েছে। এখন পর্যন্ত বাকি ১৬ জনের কোন হদিস পাওয়া যায়নি।'

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।