সোমবার ১৮ই ডিসেম্বর ২০১৭ সকাল ০৭:১২:২৩

Print Friendly and PDF

রাজাপুরে ভয়ংকর খালেক মাষ্টার!


জেলা সংবাদদাতা:

প্রকাশিত : বৃহঃস্পতিবার ৮ই সেপ্টেম্বর ২০১৬ সন্ধ্যা ০৬:৫২:৩৯, আপডেট : সোমবার ১৮ই ডিসেম্বর ২০১৭ সকাল ০৭:১২:২৩,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ১২০৯৩ বার

সময়নিউজ ডট নেট:
ঝালকাঠি: রাজাপুরে ভয়ঙ্কর আব্দুল খালেক আকন ওরফে খালেক মাষ্টার। দীর্ঘদিন যাবত এই খালেক মাষ্টারের নির্যাতনে এলাকার মানুষ এখন দিশেহারা। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখনই সেই দলের লেবাসে গত চার দশক ধরে খালেক মাষ্টার ঝালকাঠীর রাজাপুরের মানুষের উপর অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন।

একজন স্কুল শিক্ষক হয়েও চাঁদাবাজি, চুরি, অন্যের জমি দখল, সরকারী খাল দখল, অন্যের জমি থেকে গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া, অসহায় স্কুল ছাত্রীর উপর যৌন নির্যাতন, শিক্ষিকাকে যৌন হয়রানীসহ এমন কোন অপরাধ নেই যা তিনি করেননি। এলাকায় তার একটি সংঘবদ্ধ চোরের দল রয়েছে। কেউ তার কথার অবাধ্য হলে দিনের বেলায় কোন ক্ষতি করতে না পারলেও রাতের আঁধারে ওই চোরদের দিয়ে ওই ‘অবাধ্য’ ব্যক্তির বাড়িতে চুর করাবে, এমনই অভিযোগ এই খালেক মাষ্টারের বিরুদ্ধে।

তিনি এবং তার স্ত্রী মিলে স্কুলের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে স্থানীয় বাসিন্দারা। যারা মানব বন্ধন কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছেন তাদের উপর এখন নেমে এসেছে নির্যাতনের খড়গ। মিথ্যে অভিযোগ করে তাদেরকে এখন ফাঁসানোর ফন্দি করেছেন খালেক মাষ্টার।  

খালেক মাষ্টার ঝালকাঠীর রাজাপুর উপজেলার নাড়িকেল বাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা। ইতিপূর্বে এলাকার আব্দুল কুদ্দুসের সব জমি নানা ছলচাতুরি ও জোর করে গ্রাস করেছেন। সব জমি-জমা কেড়ে নিয়ে ওই আব্দুল কুদ্দুসকে এলাকা ছাড়া করেছেন খালেক মাষ্টার। এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে কোথায় আছেন আব্দুল কুদ্দুস তার হদিস নেই। কুদ্দুসের ভাই হারুনেরও বেশকিছু জমি গ্রাস করেছেন এই খালেক ও বাহিনীর লোকজন।

হারুন গাজীপুরে একটি কারখানায় কাজ করেন। সম্প্রতি তিনি বাড়িতে গিয়ে ওই জমি ফেরত চাইলে খালেক মাষ্টার ও তার বাহিনীর সদস্যরা হারুন ও তার বোনদের উপর  আক্রমন করে। হারুণ এরপর ভয়ে আর এলাকায় যাননি। হারুন বলেন, খালেক মাষ্টার এতোটাই বেপরোয়া তার পক্ষে সবকিছুই করা সম্ভব। অপর এক গরীব কৃষক আবু বকরের জমি সম্প্রতি দখল করে নিয়ে যান এই খালেক মাষ্টার। মসজিদে সম্পত্তি দেয়ার কথা বলে আব্দুল খালেক তারই এক জ্ঞাতি ভাই শাহাদাত হোসেনের জমি লিখে নিয়েছেন নিজের নামে।

সম্প্রতি খালেক মাষ্টার তারই স্কুলের এক অসহায় এতিম মেয়ে শিশুর উপর যৌন নির্যাতন চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে এলাকার মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে কয়েকদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকেন তিনি। পরে বিষয়টি দুই লাখ টাকায় রফাদফা হয় বলে জানা গেছে। এ বিষয়টি নিয়ে বাড়ির মসজিদে বসে স্থানীয় সাংবাদিক আবু সায়েম তার কাছে জানতে চাইলে খালেক আকন এবং তার ছেলে সাংবাদিক আবু সায়েমকে মারধর করেন। বিষয়টি তখন থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। পরে তিনি থানায় মুচলেকা দিয়ে মাফ পান।

কিন্তু থেমে যাননি আব্দুল খালেক। গত ২৫ মে তিনি তার প্রতিবেশী আনসারুজ্জামানের একটি গাছ কেটে নিয়ে যান। পরে আনসারুজ্জামানের পক্ষ থেকে থানা পুলিশকে অবহিত করা হলে পুলিশ গাছটি উদ্ধার করে দেয়। তবে খালেকের বিরুদ্ধে কোনই ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

এর আগে আব্দুল খালেক একটি অপহরণ মামলায় গ্রেফতার হয়ে মাস খানেক জেলে ছিলেন। বছর দু’য়েক আগে এই ঘটনা ঘটে। তারও আগে একটি মোবাইল চুরির অপরাধে তাকে স্থানীয় লোকজন তিরস্কার করে।

আব্দুল খালেকের স্কুলে যে ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে তার চেয়ে বেশী সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী দেখিয়ে তিনি উপবৃত্তি তুলছেন বলে অভিযোগ আছে। আর প্রকৃত যে শিক্ষার্থী রয়েছে তাদের ন্যায্য উপবৃত্তির টাকা থেকেও আব্দুল খালেক মাষ্টার আত্মসাত করছেন। এই এলাকায় আকন বাড়ির মসজিদ নামে একটি মসজিদ রয়েছে। খালেক মাষ্টার এই মসজিদের টাকা আত্মসাত করে আসছেন দীর্ঘদিন। এর প্রতিবাদ করায় মসজিদের একাধিক ঈমাম তার কাছে অপদস্ত হয়ে ঈমামতি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

খালেক মাষ্টারের এতো অপরাধ কর্মকান্ডের কোনই প্রতিকার নেই। এলাকার মানুষ ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছেন না। যে-ই তার অপরাধ কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করবেন তারই কোন না কোন ক্ষতি হবে। এর আগে আনসার আকন নামের এক ব্যক্তি খালেকের অপরাধ কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করেন। একদিন পরই সিঁদ কেটে আনসারের ঘরের সব মালামাল নিয়ে যায় চোরের দল। আব্দুস সালাম নামের অপর এক ব্যক্তি খালেকের অপরাধ কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করায় সালামের বিরুদ্ধে চুরির মামলা দিয়ে দেন এই খালেক।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, খালেকের কাজই হচ্ছে কোন বাড়িতে বিধবা, স্বামী পরিত্যাক্তা অথবা স্বামী বিদেশ থাকে এমন কোন নারী আছেন কিনা তার খোঁজ রাখা। তাদেরকে উত্তক্ত করা। কেউ এর প্রতিবাদ করলেই তার উপর বিপদ নেমে আসে। সম্প্রতি এক নারীকে তিনি অপবাদ দিয়ে এলাকা ছাড়া করেছেন।

সর্বশেষ গত ২২ জুলাই আব্দুল খালেক এবং তার স্ত্রী আনোয়ারা খাতুন মিলে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদানের কথা বলে ৮৪ নম্বর দক্ষিণ নারিকেল বাড়িয়া এ.কে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে গড়ে ১০০-১২০ টাকা উৎকোচ আদায় করে। এর প্রতিবাদ করলে অভিভাবকদের অনেকেই আব্দুল খালেক ও তার স্ত্রী আনোয়ারার হাতে নাজেহাল হন। আনোয়ারা বর্তমানে উক্ত স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক। দীর্ঘদিন তারা এভাবে অর্থ হাতিয়ে আসছিলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। এর প্রতিবাদ করায় অনেক শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি কেটে দেয় তারা। ওইদিন বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় সাংবাদিকরা বিষয়টি জানতে তাদের কাছে গেলে তারা সাংবাদিকদের নাজেহাল করেন।

বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা বিষয়ক কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়। এদিকে, রাতে এলাকার বাসিন্দা ও ভূক্তভোগীরা একত্র হয়ে তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষেপে যান এবং প্রতিবাদি লোকদের দেখে নেয়ার হুমকি দেন। উল্টো প্রতিবাদী মানুষদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করার হুমকি দেন এই দুর্নীতিবাজ আব্দুল খালেক। স্থানীয় সূত্র জানান, আব্দুল খালেক অবসরে রয়েছেন। কিন্তু তারপরেও ওই স্কুলের সবকিছুর তদারকি এখনো তার নিয়ন্ত্রণে।

তিনি অবসরের পরও কয়েকমাস সরকারী টাকা উত্তোলন করেছেন বলে জানা যায়। এদিকে, এই দুর্নীতি ও তার অত্যাচার নির্যাতনের প্রতিবাদে গত ৩ সেপ্টেম্বর স্থানীয় হাজির হাটে একটি মানব বন্ধন কর্মসূচী পালন করে। এই মানববন্ধন কর্মসূচীতে যারা অংশ নিয়েছেন তাদের উপর এখন অত্যাচার শুরু করেছেন খালেক ও তার বাহিনী।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আকুতি, ‘আমরা এই দুর্বৃত্ত খালেকের হাত থেকে রেহাই চাই। তার অত্যাচারের হাত থেকে আমাদেরকে বাঁচান। আমরা তার থেকে বাঁচতে চাই। চোখের সামনে সে একের পর এক অপরাধ করে যাচ্ছে। আমাদের উপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে পারছি না।’

স্থানীয় সূত্র জানায়, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দলের লেবাস ধারণ করে এই আব্দুল খালেক। যে কারণে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েও কোন লাভ হয় না। এভাবে গত চার দশক ধরে এলাকার মানুষের উপর অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে আসছেন এই খালেক ও তার বাহিনী।