শনিবার ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৯ সকাল ০৭:০২:০৪

Print Friendly and PDF

রোহিঙ্গারা ফিরতে রাজি নয়


ডেস্ক রির্পোট:

প্রকাশিত : বৃহঃস্পতিবার ২২শে আগস্ট ২০১৯ সকাল ০৮:৫৫:২৯, আপডেট : শনিবার ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৯ সকাল ০৭:০২:০৪,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫২ বার

বহুল প্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার প্রথম দফায় ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গার দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশকে অনাপত্তিপত্র দিয়েছে মিয়ানমার। এখন এসব রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু হয়েছে।

তবে রোহিঙ্গারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নাগরিকত্ব প্রদান, ভিটেবাড়ি ও জমিজমা ফেরত, আকিয়াব জেলায় আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের নিজ বাড়িতে ফেরত, কারাগারে বন্দিদের মুক্তি, হত্যা-ধর্ষণের বিচার, অবাধ চলাফেরার নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা প্রদানসহ একাধিক শর্ত পূরণ ছাড়া তারা দেশে ফিরে যেতে রাজি নয়। ফলে আজকের নির্ধারিত প্রত্যাবাসন শুরু হবে কিনা সেটি নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যেই প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা কিছু রোহিঙ্গা গতকাল বুধবার ও তার আগের দিন ২৬ নম্বর ক্যাম্পের সিআইসি (ক্যাম্প ইনচার্জ) অফিসের সামনে বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় নিজেদের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রত্যাবাসনের তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গারা টেকনাফের চারটি ক্যাম্পে বসবাস করছে। এ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সফল করতে এরই মধ্যে সব রকমের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে বাংলাদেশ। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা এখন কক্সবাজার অবস্থান করছেন। বান্দরবানের ঘুমধুম ট্রানজিট পয়েন্ট প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি ৫টি বাস, ২টি ট্রাক আজ সকাল থেকে টেকনাফের

শালবন ক্যাম্পে থাকবে। এ ছাড়া প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে নিরাপদ করতে ক্যাম্প ও সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে; প্রস্তুত আছে মেডিক্যাল টিমও। আজ থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো শুরু হবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রত্যাবাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, তালিকায় থাকা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা। আমরা আমাদের দিক থেকে প্রস্তুত। কিন্তু গত বছরেও সব কিছু প্রস্তুত থাকার পরও রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভের কারণে প্রত্যাবাসন ভ-ুল হয়ে যায়। তাই আমরা সতর্ক রয়েছি।

মিয়ানমার দ্বিতীয় দফায় পরিবার ও গ্রামভিত্তিক যাচাই-বাছাইয়ের পর মংডু এবং বুথিডংয়ের ৩ হাজার ৪৫০ জনকে গ্রহণে তারা অনাপত্তি দেয়। যদিও এ অনাপত্তি তালিকায় বাংলাদেশ বেশ কিছু অসঙ্গতি পায়। সেখানে ১ হাজার ৫৬টি পরিবারের ৩ হাজার ৪৫০ জনের নাম রয়েছে। কিন্তু তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৫টি পরিবারের ৪৭ জনের নাম দুবার স্থান পেয়েছে। দ্বিতীয়ত যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ নাম পাঠায়নি এমন তিনটি পরিবারের চারজনের নাম মিয়ানমার তালিকায় যুক্ত করে দিয়ে ফেরত চেয়েছে।

সব মিলে অতিরিক্ত ১৮টি পরিবারের ৫১ জনকে বাদ দিয়ে সংশোধিত একটি তালিকা করেছে বাংলাদেশ। সংশোধিত তালিকায় থাকা ১ হাজার ৩৮টি পরিবারের ৩ হাজার ৩৯৯ জনের চূড়ান্ত মতামত গ্রহণের জন্য চুক্তি অনুযায়ী গত ৮ আগস্ট জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাকে (ইউএনএইচসিআর) দায়িত্ব দেয় বাংলাদেশ। গত মঙ্গলবার ও বুধবার তালিকায় থাকা ২৩৫টি পরিবারের সাক্ষাৎকার শেষ করেছে সংস্থাটি। আজও সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সাক্ষাৎকার চলবে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত দুদিনের সাক্ষাৎকারে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিকত্ব, রাখাইনে জমি ফিরে পাওয়া, নিজেদের পূর্ণ নিরাপত্তার শর্ত পূরণ ছাড়া ফিরে যাবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।

প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা নুর হাশেম নামে এক রোহিঙ্গা জানান, তাদের কিছু শর্ত রয়েছে, যা মানলে তারা মিয়ানমারে ফেরত যেতে রাজি। অন্যথায় তারা ফিরবেন না। এমনকি গুলি করে মেরে ফেললেও তারা শর্তপূরণ ছাড়া ফিরতে রাজি নয়। মো. জুবাইর নামে আরেক রোহিঙ্গা বলেন, ইউএনএইচসিআরের একটি প্রতিনিধি দল সকালে এসে আমাদের পারিবারিক ডাটা কার্ড খোঁজে। তারা আমাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কিছু জানায়নি। পরে জানতে পারি, প্রত্যাবাসন তালিকায় আমার নাম রয়েছে। মিয়ানমারে আমার বাড়ি ছিল বুচিডং চাংচিপ্রাং এলাকায়। আমি নিজের দেশে ফিরতে ব্যাকুল হয়ে আছি। তবে নাগরিকত্ব, ভিটেবাড়ি ও জমিজমা ফেরত, অবাধ চলাফেরা ও নিরাপত্তা দিলেই ফিরব। এভাবে গেলে মরণ নিশ্চিত। এর চেয়ে এ দেশে মৃত্যুই ভালো হবে। তালিকায় থাকা হাসিনা বেগম নামে আরেক রোহিঙ্গা নারী বলেন, স্বামী-সন্তানদের নিরাপত্তা কে দেবে? ওখানে গিয়ে আশ্রয়শিবিরে রাখবে। অবাধ চলাফেরা করা যাবে না।

জয়নব বেগম নামে এক নারী বলেন, মিয়ানমার সরকারকে বিশ্বাস করা যায় না। এর আগেও তারা অনেকবার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। তাই সরাসরি নাগরিকত্ব প্রদান করলেই আমরা ফিরতে পারি। শালবন ক্যাম্পের ডি-ব্লকের রোহিঙ্গা মাঝি নুর মোহাম্মদ এসব দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, মিয়ানমারের ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর মতো রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দিতে হবে। পূর্ণ নাগরিকত্ব দিয়ে চলাফেরার স্বাধীনতা দিতে হবে। আবার সাধারণ রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, ক্যাম্পে তারা স্বাধীন মতামত দিতে পারছেন না। একটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপ সবসময় তাদের ওপর নজরদারি করছে।

এদিকে গতকাল মিয়ানমার এবং বাংলাদেশে কর্মরত ৬১টি স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো এক যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন এইড থেকে প্রকাশিত এ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই বছরেও ন্যায়বিচার পায়নি মিয়ানমারে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। শরণার্থী হিসেবে তারা এখন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে সুরক্ষা ও মর্যাদার জন্য। এর মধ্যেই মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনবিষয়ক সাম্প্রতিক খবরে শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন রোহিঙ্গারা। তারা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত। যেহেতু এ প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত তাই ভবিষ্যৎ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সুরক্ষিত হয় না।

বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো প্রক্রিয়ায় সাড়া দিয়েছেন হাতেগোনা কয়েকটি রোহিঙ্গা পরিবার। ইউএনএইচসিআর এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের কাছে এমন মনোভাব প্রকাশ করেছে তারা।