বৃহঃস্পতিবার ২২শে আগস্ট ২০১৯ বিকাল ০৩:৪৪:৪২

Print Friendly and PDF

প্রিয়া সাহাকে নিয়ে যা বললেন গোলাম মাওলা রনি


গোলাম মাওলা রনি:

প্রকাশিত : মঙ্গলবার ৩০শে জুলাই ২০১৯ সকাল ১১:০৮:০৬, আপডেট : বৃহঃস্পতিবার ২২শে আগস্ট ২০১৯ বিকাল ০৩:৪৪:৪২,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫২ বার

প্রিয়া সাহা (বামে) ও গোলাম মাওলা রনি।

সম্প্রতি ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার ‘নালিশ’ ইস্যুতে নানা আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এবার এ বিষয়ে মুখ খুললেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি।

তিনি তার ইউটিউব চ্যানেলে বলেন, সম্প্রতি প্রিয়া সাহা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে একটি বক্তব্য দিয়েছেন যে বাংলাদেশ থেকে বহু সংখ্যক গুম হয়ে গেছেন। এই সংখ্যাটা হলো এমন আজগুবি, প্রায় পৌনে চার কোটি। প্রিয়া সাহার এই বক্তব্য নিয়ে এখন সারা বাংলাদেশে ঝড় বইছে। কেউ বলছেন, রাষ্ট্রদোহ অন্যায় করেছেন। কেউ প্রিয়ার গ্রেফতার দাবি করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে একটি গ্রুপ যারা সরকারের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত, তারা বললো-প্রিয়াকে ছাড়া হবে না।তার বিচার করা হবে। তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে, জবাবদিহী করতে হবে।”

গোলাম মাওলা রনি বলেন, “এ ধরনের কথাবার্তা যখন চলছিল তখন যারা প্রিয়া বিরোধী তারা সবাই এক হয়ে প্রিয়া চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার শুরু করে দিল। এরই মধ্যে মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি বর্তমানে লন্ডনে চোখের চিকিৎসা করাচ্ছেন, সেখান থেকে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদককে নির্দেশনা দিলেন- এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি না করতে। তিনি বললেন- এটা খুব ছোট্টা একটা বিষয়। প্রিয়াকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। তার কথা শুনতে হবে।”

“আপনারা জানেন- বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুটো দলই মূলত নেতা নির্ভর দল। নেতার কথায় তারা লাফায়। নেতা যা বলেন তার সঙ্গে আরও ১০ ডিগ্রি যোগ করে তারা সেভাবে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন,” উল্লেখ করেন সাবেক এই এমপি।

তিনি বলেন, “যে-ই প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দিলেন, মুহূর্তের মধ্যে আওয়ামী লীগের লোকজন যারা প্রিয়ার বিরুদ্ধে বিরাট বিরাট রচনা করে, একেবারে লাঠি, বোমা, গুলি নিয়ে হম্বিতম্বী শুরু করেছিলেন, তারা মুহূর্তের মধ্যে এমন চুপসে গেলেন, কথা রীতিমতো ১৮০ ডিগ্রি উল্টো হয়ে গেল। অর্থাৎ যারা প্রিয়ার বিচার চাইতো এখন তারা বলে না, প্রিয়াকে গ্রেফতার করা হবে না। উল্টো তাকে পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হবে।”

“এই সমস্ত কথাবার্তা যখন চলছিল, তখন যারা বাইরে সন্দেহ করতো তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিল।প্রথম দেখা গেল- প্রিয়া একদিকে আর গোটা দেশ আরেক দিকে। এটা ছিল এক ধরনের রসায়ন। আবার যখন দেখা গেল যে সরকারের পক্ষ থেকে প্রিয়ার পক্ষাবলম্বন করা হলো, তখন তারা (বিভিন্ন ওয়াজ-নসিহতে যেমন: চরমোনাই, পীর মাশায়েখ) ধরে নিল যে, প্রিয়ার পিছনে ইহুদি চক্রান্ত আছে।

তার পেছনে ভারত আছে, আমেরিকা আছে। প্রিয়ার একটা চুলও আওয়ামী লীগ সরকার স্পর্শ করতে পারবে না। তখন কী হলো- প্রিয়ার সঙ্গে পুরো আওয়ামী লীগ একদিকে চলে গেছে। আর সমগ্র দেশ চলে গেছে প্রিয়ার বিরুদ্ধে। আর এই বিতর্ক সহজে থামবে না,” যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, “এর কারণটা হলো- আসলে দেশে গণতন্ত্র নেই তো, মানুষের বলার কোনও সুযোগ নেই, প্রত্যেকটা মানুষ ভয় পায়। তারা আসলে এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ সরকারকে গালাগালি করতে চায়। তারা ভোট চুরি নিয়ে কথা বলতে চায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে চায়। এছাড়া শেয়ার মার্কেট থেকে শুরু করে অন্যান্য যে সকল কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়ে মিছিল করতে চায়, মিটিং করতে চায়। কিন্তু ভয় যে মামলা-মোকদ্দমা হবে। ঝক্কি-ঝামেলা হবে। এই জন্য তারা এই ভয়টাকে মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে প্রিয়াকে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই মিলে ‘ছেলেধরা’র মতো ঝাপিয়ে পড়েছে ।”

গোলাম মাওলা রনি বলেন, “মানুষের এই যে ক্ষোভ, আমি মনে করি- এটাকে এক লক্ষ ভাগ করলে এর এক ভাগ হলো প্রিয়ার ওপর। আর বাকিটা পুরো ক্ষোভটা কিন্তু সরকারের ওপর। সরকারের ক্ষোভটা সরকারের ওপর ঝাড়তে না পেরে প্রিয়ার ওপরে ঝাড়ছে।”
তিনি বলেন, “আর প্রিয়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুব সাধারণ একজন রমণী। তার স্বামী মলয় সাহা। তিনি আসলে আমার বন্ধু মানুষ। আমি মলয়কে চিনি। তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ-পরিচালক। খুব সাধারণ পরিবার।”

তিনি বলেন, “আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট অনেক লোককেই নেয়। এটা এমন কিছু না। দেখা গেল, স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট হলো, সারা পৃথিবীর ২০০/২৫০ দেশ থেকে লোক এনে সেমিনার করলো। আবার অনুষ্ঠানের সবাইকে এক সঙ্গে নিয়ে কখনও হোয়াইট হাউস দেখাতে নিয়ে যায়, কখনও মার্কিন কংগ্রেস দেখাতে নিয়ে যায়। তো এরই ফাঁকে হয়তো তারা সুযোগ পেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেয়েছে। এটা এমন কিছু না। তো এই মলয়ের স্ত্রী প্রিয়া, সাধারণ একটি ফ্যামিলি, সাধারণ একটা অবস্থা থেকে ওখানে গেছেন। আসলে মানুষের এই ক্ষোভটা প্রিয়ার ওপর না। এই ক্ষোভটা আসলে সরকারের প্রতি। আর এই ক্ষোভের কবলে পড়ে প্রিয়া এবং প্রিয়ার পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ফলে তারা সকাল-বিকাল একেক ধরনের কথা বলে বিষয়টিকে আরও জটিল করে ফেলেছে।”

গোলাম মাওলা রনি বলেন, “যখন প্রিয়া সাহা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন তার গলা কাঁপছিল। তিনি ৩ মিলিয়ন বলতে গেছেন, নাকি ৩ শত বা ৩ হাজার বলতে গেছেন, সে ব্যাপারে তার আসলে তার কোনও মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। তিনি যখন ট্রাম্পকে দেখেছেন, তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন, মুহূর্তের মধ্যে তিনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন এবং তার মুখে যা এসেছে তিনি তা-ই বলে গেছেন। আমি নিশ্চিত যে, তিনি এ কথা বলার জন্য যে খুব পরিকল্পনা নিয়ে গেছেন, বিষয়টা আসলে তা নয়।”

তিনি বলেন, “তার ওই বক্তব্যের পর যখন সারা বাংলাদেশ গর্জে উঠল, তখন প্রিয়া সাহা ভয় পেয়ে গেছে, এমন অবস্থায় তিনি একটা বিবৃতি দিলেন। তখন তিনি বললেন, এটা তিনি শিখেছেন বা জেনেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে। কারণ শেখ হাসিনা বিগত দিনে যখন বিরোধী দলে ছিলেন, তখন তিনি বিভিন্ন সময় বলেছেন যে, বাংলাদেশ থেকে এত সংখ্যক বা তিন কোটি হিন্দু চলে গেছে। প্রিয়া এখানে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে তার গ্রুপের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। আপনারা জানেন- আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরা যখন সরকারের বাইরে থাকেন, তখন এক ধরনের কথা বলেন। আর যখন সরকারে থাকেন তখন এক ধরনের কথা বলেন। শেখ হাসিনা যখন সরকারের বাইরে ছিলেন তখন অনেক কথাই উনি বলেছেন। এখন সেই কথা তার বিরুদ্ধে কেউ মনে করতে বা রাখতে চায় না। কিন্তু প্রিয়া এই ক্রিটিক্যাল মোমেন্টে এই ধরনের কথা বলে প্রধানমন্ত্রীকে বড় করলেন নাকি ছোট করলেন। প্রিয়া প্রধানমন্ত্রীকে তার দলে এনে তিনি কি নিজের ক্ষতি করলেন নাকি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষতি করলেন, এটা তিনি চিন্তা করেননি। ফলে বিষয়টা এক ধরনের জগাখিচুরি মার্কা হয়ে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “আরও একটা বিষয় সামনে এসেছে। দেখা গেছে তিনি (প্রিয়া) ইহুদিদের সঙ্গে একটা বৈঠক করেছেন। ইহুদি রাষ্ট্রের একজন মন্ত্রী এবং অন্য দেশের একজন মন্ত্রীর একটা ডিনার পার্টি চলছিল, সেই ডিনারে প্রিয়া বসা ছিলেন, এমন একটা ছবিও প্রকাশ্যে এসেছে।”

গোলাম মাওলা রনি বলেন, “বাংলাদেশের যে সমস্ত সাংবাদিক, সমাজকর্মী, নেতা যারা বিভিন্ন সময় স্টেট ডিপার্টমেন্টে গেছেন, তারা জানেন যে, স্টেট ডিপার্টমেন্ট আমন্ত্রিত অতিথিদের সম্মানে একাধিক ডিনার পার্টির আয়োজন করে থাকে। কখনও বাসায়, কখনও হোটেলে। এই ডিনার পার্টিতে বিভিন্ন লোক আসে। প্রিয়াও এ রকম একটা ডিনার পার্টিতে গিয়েছেন। কাজেই প্রিয়ার এই ছবিটিও আরেকটা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
তিনি বলেন, “প্রিয়া আসলে এই ধরনের একটার পর একটা কাজ করে বিষয়টিকে জগখিচুরি বানিয়ে ফেলেছেন। এটা যেমন সত্য, তার সঙ্গে আরও একটা আশঙ্কার ব্যাপার কিন্তু আছে। প্রিয়া এটার সঙ্গে জড়িত থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে, আমি জানি না।”

তিনি বলেন, “আশঙ্কার ব্যাপারটা হলো- আপনারা সকলেই জানেন যে, বিজেপি সরকার দ্বিতীয় দফায় ভারতে ক্ষমতায় আসার পর তারা একটা বিরাট রোডম্যাপ তৈরি করেছে যে, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মিজোরাম, ত্রিপুরা থেকে প্রায় ১ কোটি (প্রাথমিক স্তরে ৪০ লাখ) এর একটা তালিকা করেছে, যারা ভারতীয় হিন্দু এবং ভারতীয় মুসলমান। এদের ব্যাপারে তারা বলছে, এই লোকগুলো বাংলাদেশের। তারা অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে ভারতে বসবাস করছে। বিজেপি এই লোকগুলোকে বাংলাদেশে ঢুকাতে চাচ্ছে। তারা এটা দুটো কারণে করতে চাচ্ছে। প্রথম কারণ হলো- বাংলাদেশের প্রতি এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করা। আর দ্বিতীয় কারণ- এই লোকগুলোর সবাই কংগ্রেসকে ভোট দেয়। অনাদিকাল থেকে এই সমস্ত এলাকায় তারা কংগ্রেসকে ভোট দেয়, আর পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দোপাধ্যায়কে ভোট দেয়। মমতা ও কংগ্রেসের হাত দুর্বল করার জন্য মূলত বিগত ১০ বছর যাবৎ বিজেপি একটা আন্দোলন করার চেষ্টা করছে। কাজেই প্রিয়া সাহার এই কথার মধ্যে যদি বিজেপির কোনও চক্রান্ত থাকে যে ঠিক আছে তারা বাংলাদেশ থেকে চলে গেছে, বাংলাদেশে জায়গা আছে, জমি আছে, তো সেই জমি তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। তাদের সত্ব, নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হোক। ভারতে বিজেপি সরকার এই দাবি তুলে যদি তাদেরকে রোহিঙ্গাদের মতো পুশব্যাক শুরু করে, আপনি বিশ্বাস করেন বাংলাদেশে ম্যাসাকার হয়ে যাবে।”

“প্রিয়ার এই ব্যাপারটা একদিকে যেমন ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ আছে, তেমনি এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশি আমাদেরকে নিয়ে যেন খেলতে না পারে এবং আমাদের জাতীয় জীবনে যেন দ্বিতীয় রোহিঙ্গা ঘটনা না ঘটে, সেই ব্যাপারেও আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। সেই সঙ্গে প্রিয়া সাহার এই জগাখিচুরির কবলে পড়ে, দেশ ও জাতির মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে, আমাদের এই উত্তেজনাটাকে যাতে সীমান্তের অপর পাড়ে ঠেলে দেওয়া না হয়, এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার জন্য আমি সবাইকে অনুরোধ করছি।