মঙ্গলবার ২০শে আগস্ট ২০১৯ বিকাল ০৪:৪০:৫১

Print Friendly and PDF

মায়ের ওপর অনেক রাগ ছোট্ট তুবার


ডেস্ক রিপোর্ট:

প্রকাশিত : মঙ্গলবার ১৩ই আগস্ট ২০১৯ সকাল ০৯:২৫:১২, আপডেট : মঙ্গলবার ২০শে আগস্ট ২০১৯ বিকাল ০৪:৪০:৫১,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪১ বার

গেল ঈদে দুই সেট জামা পেয়েছিল তাসমিন মাহিরা তুবা। তাতেই অনেক খুশি ছিলো; হৈ-হুল্লোড়ে মাতিয়ে রেখেছিল পুরো ঘর। কোরবানির ঈদে সে পেয়েছে ১৯ সেট জামা ও ৯ জোড়া জুতা- কিন্তু খুশি নেই চার বছরের ফুটফুটে শিশু তুবার মনে। কারণ অনেক দিন হলো মায়ের মুখটি দেখে না সে।

২৩ দিন আগে তুবাকে ড্রেস আনার কথা বলে তার মা তাসলিমা বেগম রেনু নিচে গিয়েছিলেন। আসার সময় চিপস, চকলেটও নিয়ে আসবেন বলেছিলেন। কিন্তু ড্রেস, চকলেট ও চিপস কিছুই আনেননি তার মা; উল্টো তুবাকে না বলেই তিনি চলে গিয়েছেন বিদেশে, ভাইয়ের কাছে। আসলে এই কথাটি তাকে বোঝানোর জন্য বলেছিল পরিবারের সদস্যরা।

আজ ঈদের দিনেও মোবাইলে মায়ের সঙ্গে কথা বলার অনেক চেষ্টা করেছে তুবা। কিন্তু মা তার ফোন ধরেন না, কেটে দেন তুবার লাইন। তাই মায়ের উপর অনেক রাগ তুবার।

যদিও একদণ্ডের জন্য মায়ের ছবি হাতছাড়া করেনি তুবা। ঘুম ভাঙার পর থেকে রাত পর্যন্ত বুকের মাঝে জামার ফিতের সঙ্গে বেধে রেখেছিলো সে রেনু মায়ের ছবি। নতুন কেউ ঘরে আসলেই তড়িঘড়ি করে টেবিলের ওপর পারিবারিক অ্যালবাম নিয়ে বসে, সেখান থেকে মায়ের ছবি বের করে অন্যদের দেখিয়ে তুবা বলে, ‘এইটা আমার মা। অনেক চকলেট নিয়ে আসবে মা।’

গত ২০ জুলাই রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছেলেধরা সন্দেহে হত্যা করা হয় তুবার রেনু মাকে। তুবাকে স্কুলে ভর্তির জন্য খোঁজ নিতে গিয়ে স্কুলের ভেতরই গণপিটুনিতে নিহত হন তিনি।

তুবা এখনো না জানলেও তার বড় ভাই তাসিন আল মাহির জানে সন্দেহের বলি হয়েছেন তাদের প্রাণ প্রিয় মা। আজ ঈদের দিনেও মাহির ও তুবার কোনো খোঁজ নেননি তাদের বাবা তসলিম হোসেন। অসময়ে তাদের ছেড়ে রেনু মায়ের চলে যাওয়া আর বাবার উদাসিনতায় আজ দিনভর অভিমান করে ছিল মাহির।

রাজধানীর মহাখালীতে তুবার নানীর বাসায় আজ সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে গিয়েও দেখা গেছে মলিন মুখে বসে আছে মাহির। আর খেলনার চুলায় খিঁচুড়ির রান্না বসিয়েছে তুবা। দুষ্টুমিতে পুরো ঘর মাতিয়ে রেখেছে সে।

নিহত রেণুর বড় বোন নাজমা বেগম আমাদের সময়কে জানান, তুবা আর মাহির এবার তার নানী সবুরা খাতুন, বড় খালা নাজমা বেগম, খালোতো ভাই সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু, খালোতো ভাই ইরাম ও ইজাজের সঙ্গে কোরবানির ঈদ করেছে। কিন্তু বাসায় ছিলো না ঈদের কোনো আমেজ।

রেনু বেঁচে থাকতে ঈদের তিন দিন আগে থেকেই বাসায় ঈদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। নিজে হাতে তিনি সবার হাতে মেহেদি পরিয়ে দিতেন, তুবাকেও দিয়ে দিতেন। হরেক পদের রান্না করতেন। এবার সে রকম আমেজ কিছুই ছিল না।

ঈদের দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘুম থেকে ওঠে তুবা। গোসল সেরে নাজমা বেগমের দেওয়া কমলা রঙের জামা পড়ে খুনসুটিতে মেতে ওঠে সে। এর মাঝেই কয়েকবার সে নানীর মাধ্যমে তার রেনু মায়ের কাছে ফোন দেওয়ায়। কিন্তু মা ফোন না ধরায় রাগ করে কিছুক্ষণ কান্না করে। পরে মায়ের হিল জুতা পায়ে দিয়ে সারা ঘর হেঁটে বেড়ায়। অনেক বুঝিয়ে শান্ত করার পর সেমাই খেয়ে বেরিয়ে পড়ে সে ভাইয়ের সঙ্গে।

গরু ভয় পায় তুবা, তাই কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে। তারপর নুডুলস, পোলাও ও চিকেন ফ্রাই খায়। পরে হাতে করে কয়েকটি চকলেট নিয়ে ফের বেরিয়ে পড়ে নানীর সঙ্গে।

নাজমা আরও বলেন, ‘মাহির সকাল ৮টার দিকে ঘুম থেকে উঠেই কোরবানির গরুর সেবাযত্নে লেগে পড়ে। এরপর গোসল করে পাজামা-পাঞ্জাবি পরে খালাতো ভাইদের সঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে বাসায় ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মা’রেনুর জন্য অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে সে। অপেক্ষায় ছিলো বাবা আসবে। কিন্তু তিনি আসেননি। সন্ধ্যা পর্যন্ত ফোনও দেননি। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মায়ের কথা ভেবে আবারও কান্না করে মাহির। তাকে সামলানোটাই তখন দায় হয়ে পড়ে। অনেক বুঝিয়ে তাকে শান্ত করা হয়। এই বয়সে দুটি শিশুর এমন পরিণতি কোনো ভাবেই আমরা মেনে নিতে পারছি না।’ এদিকে রেনুর কথা ভেবে শয্যাশায়ী প্রায় তুবার নানী সবুরা খাতুন। দুই শিশুকে যারা এতিম করলো তাদের ফাঁসি দাবি করেন তুবার বড় খালা নাজমা বেগম।

তাসলিমা বেগম রেনু হত্যাকাণ্ডের পর তার ভাগনে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টটিু বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় হত্যা মামলা করেন। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী মামলা দায়ের করেছিলাম। কিন্তু এখন ঘটনার বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখে মনে হচ্ছে, মূল আসামিরা এখনও রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কিন্তু যে স্কুলে ঘটনা সেই স্কুলের কাউকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি।’

টিটু আরও বলেন, অথচ এই হত্যাকাণ্ডে স্কুল কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না। ঘটনার পরপর বলা হয়েছিল, তালা ভেঙে জনগণ ভেতরে ঢুকে রেনু খালাকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করে। কিন্তু একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, এক ঘণ্টা স্কুলে আটকে রাখা হয়েছিলো রেনু খালাকে। স্কুল থেকেই গুজব ছড়ানো হয়। কেউ একজন ভেতর থেকে তালা খুলে দেয়ার পর জনগণ ভেতরে ঢোকার সুযোগ পায়। সুষ্টু তদন্তের জন্য হত্যা মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) মাধ্যমে তদন্তের দাবিও জানান মামলার এই বাদি।