শুক্রবার ২২শে নভেম্বর ২০১৯ সকাল ১০:৫৮:২৩

Print

জড়িতদের বরখাস্তসহ শাস্তি দাবিযমুনা কোম্পানীর ট্যাংকে অতিরিক্ত ৬৫ হাজার লিটার ফার্নেস অয়েল!


জেহাদ চৌধুরী:

প্রকাশিত : মঙ্গলবার ২০শে আগস্ট ২০১৯ দুপুর ০২:৫৯:১০, আপডেট : শুক্রবার ২২শে নভেম্বর ২০১৯ সকাল ১০:৫৮:২৩,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩২৩ বার

যমুনা অয়েল কোম্পানির ট্যাংকে অতিরিক্ত ৬৫ হাজার লিটার ফার্নেস অয়েল পাওয়ার ঘটনায় ফুসে উঠছে তেল সেক্টর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই তেল চোরাই পথে বিক্রির অপেক্ষায় ছিল। এই সেক্টরে কর্মরতরা এর সাথে জড়িতদের বরখাস্তসহ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, যমুনা অয়েল কোম্পানী লিমিটেড তিনটি বিপনী কোম্পানীল মধ্যে প্রথম স্থানে ছিল। কিন্তু বর্তমানে কয়েকজন অসাধ্য কর্মকর্তার কারণে যমুনা অয়েল এখন তৃতীয় স্থানে রয়েছে। একইসাথে এসব অসাধু কর্মকর্তাদের কারণে কোম্পানীও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

সূত্র মতে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জিএম আবু হানিফের নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম গত শুক্রবার একাধিক ট্যাংকের তেল পরিমাপ করে অতিরিক্ত ৬৫ হাজার লিটার ফার্নেস অয়েল পান। যমুনা অয়েল কোম্পানির প্রধান স্থাপনা গুপ্ত খালস্থ ১ ও ৭ নম্বর ট্যাংক পরীক্ষা করে অতিরিক্ত এই ফার্নেস অয়েল পাওয়া যায়। ইতিপূর্বে ২০১৭ সালে যমুনা অয়েল কোম্পানির প্রধান স্থাপনা গুপ্ত খাল থেকে খুলনা ও নারায়ণগঞ্জগামী দুটি জাহাজে অতিরিক্ত তেল ভর্তি করে নেয়ার ঘটনায় তিন জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছিল। উক্ত তেল চুরির ঘটনার বিষয়টি এখনো বিচারাধীন। এবারের ঘটনায় তেল সেক্টরের সংশ্লিষ্টরা জড়িতদের কঠোর শাস্তির দাবি করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে যমুনার এক কর্মকর্তা সময়নিউজকে জানান, এমটি প্রবির নামের জাজাজ থেকে ফার্নেস তেল খালাসের পর ০১ নং ট্যাংক এ ৬৫ হাজার লিটার তেল বেশী ছিল। এই ফার্নেস তেল চোরাইভাবে বিক্রির জন্য প্রস্তুতি নেয়ার সময় বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়। গত ১৪ আগস্ট এমটি প্রবির জাহাজটি রিলিজের পর টার্মিনাল ম্যানেজারের ভ্রারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা উপ মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) জসিমউদ্দিন ও বিও হিসেবে দায়িত্বে থাকা মঞ্জুর কাদের গং শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো ৬৫ হাজার লিটার ফার্নিস তেল আই টি টিতে গেইন দেখায়। ট্যাংক নং- ০১ এবং ০৭ এ আনুমানিক ২,১৮,৩৩৪ লিটার তেল আই টি টি দেখানো হয়। প্রায় ৬৫ হাজার লিটার তেল আই টি টিতে লাভ দেখানো হয়। তারা বলছেন, ০১ ও ০৭ নং দুইটি ট্যাংকের তেল আই টি টির যোগফলে কখনোই ৬৫ হাজার লিটার তেল গেইন হওয়া সম্ভব নয়। আই টি টি দেখিয়ে তেল চুরির বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার একটি অভিনব কৌশল মাত্র।

এদিকে নিজেদের দায় এড়ানোর জন্য তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে ৬৫ হাজার লিটার তেল গেইন হয়েছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা। এমটি প্রবির জাহাজ খালাসের পর ট্যাংক নং ০১ এ ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড় করা হয়। ট্যাংক নং ৭ এ পূর্বের রেকর্ড় ছিল৩৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস। মাত্র ৪ ডিগ্রির ব্যবধানে ২১৮৩৩৪ লিটার তেল আই টি টিতে বৃদ্ধি হওয়ার কথা আনুমানিক ৫৩২ লিটার। কিন্তু ৬৫ হাজার লিটার তেল কিভাবে ট্যাংক নং ০১ থেকে ট্যাংক নং ৭ এ উদ্বিৃত্ব হলো সেটিই বড় প্রশ্ন। এতে প্রমাণিত হয় যে, এমটি প্রবির নামের জাহাজটি রিলিজের পর ট্যাংক নং ০১ এ ৬৫ হাজার লিটার তেল বেশী ছিল। ঘটনাটি ফাঁস হবার পর ৬৫ হাজার লিটার চোরাই তেল সরাতে না পেরে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো আই টি টিতে ট্যাংক নং ০১ থেকে ট্যাংক নং ৭ এ গেইন (লাভ) দেখানো হয়।

তেল সেক্টরের কয়েকজন জানান, এ ঘটনা তদন্তে বিপিসি একটি তদস্ত কমিটি করেছে। কিন্তু অসাধু এই কর্মকর্তারা তদন্ত কমিটিকে ম্যানেজ করে প্রতিবেদন নিজেদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, সুষ্ঠু তদন্ত না হলে তেল সেক্টরে বিক্ষোভ চলতে থাকবে। তারা বলেন, বিপিসি তদন্ত দল ৬৫ হাজার লিটার ফার্নিস অয়েল চুরির ঘটনায় যমুনা অয়েল কোম্পানীকে ফার্নিস অয়েল আমদানি না করার জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য ফার্নিস অয়েল আমদানি না করার সিদ্ধান্ত হবে অযৌক্তিক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট দেশের প্রধান তেল স্থাপনা গুপ্ত খাল এলাকায় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির তেল লোপাটের সাথে জড়িত রয়েছে। বিদেশ থেকে তেল আসার পর জাহাজ থেকে পাইপযোগে কর্ণফুলী নদী সংলগ্ন তেল কোম্পানিসমূহের ট্যাংকে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে ঐ জ্বালানি তেল নৌপথে, রেলওয়ে ওয়াগন ও ভাউজারযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছানো হয়। জাহাজ থেকে তেল গ্রহণ এবং তা নৌ জাহাজ, রেল ওয়াগন ও ভাউজারে ভর্তি করার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে করা হয়ে থাকে। এতে করে তেলের পরিমাণ কম-বেশি করার ক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট কাজ করে থাকে। বিশেষ করে তেল গ্রহণ ও দেয়ার ক্ষেত্রে তাপমাত্রা এবং তেলে ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে পরিমাণগত কম-বেশি করা হয়। গুপ্ত খালস্থ প্রধান স্থাপনায় দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজ চক্রই কারসাজির মাধ্যমে তেল চুরি করে তা বাইরে বিক্রি করে থাকে।

বিপিসির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ৬৫ হাজার লিটার অতিরিক্ত তেল পাওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। কারণ তাপমাত্রার কম-বেশির কারণে এতো বেশি পরিমাণ তেল (গেইন/অর্জন) হতে পারে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির ঐ কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তেল চুরির ঘটনায় কার্যকর শাস্তিমূলক ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় তেল চুরির ঘটনা একপ্রকার ওপেন সিক্রিট হিসেবে আলোচিত। তাছাড়া বিশ্বে তেল সেক্টর সম্পূর্ণ অটোমেশন প্রক্রিয়ার আওতায় থাকলেও বাংলাদেশের তেল সেক্টর ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে চলে আসছে। তবে সম্প্রতি একটি বিদেশি কোম্পানির সাথে পুরো তেল সেক্টরকে অটোমেশনের আওতায় আনার চুক্তি হয়েছে বলে বিপিসি থেকে জানানো হয়।

এদিকে যমুনার তিনটি ট্যাংকে অতিরিক্ত তেল পাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমিয়ে রাখা ও বিক্রি করতে না পারায় পরিমাণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে জাহাজ থেকে তেল গ্রহণের সময় বেশি তাপমাত্রা দেখিয়ে জাহাজে তেলের লোকসান বেশি দেখানো হয়।

বিপিসির জিএম (বাণিজ্যিক) আবু হানিফ সময়নিউজকে জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ট্যাংকসমূহের তেল মাপে অতিরিক্ত তেল পাওয়া গেছে। যমুনা অয়েল কোম্পানির এমডি গিয়াসউদ্দিন আনসারি জানান, তেল তাপমাত্রার কারণে গেইন হয়েছে। অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না তা তিনি জানেন না। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।