বুধবার ১৩ই নভেম্বর ২০১৯ রাত ০৮:৫২:১১

Print

কি ব্যবস্থা নিবে রাজউক?১২ তলার প্ল্যানে ১৫ তলা!


জেহাদ চৌধুরী:

প্রকাশিত : রবিবার ৭ই জুলাই ২০১৯ সকাল ০৮:৪০:৩৭, আপডেট : বুধবার ১৩ই নভেম্বর ২০১৯ রাত ০৮:৫২:১১,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫৬৪ বার

ফ্রেন্ডস টাওয়ার। ২৭ অভয় দাস লেন, টিকাটুলী ঢাকা। এই ভবনের জমির মূল মালিক আলহাজ ইঞ্জিনিয়ার মহসিন আহম্মেদ। ছবি: সময়নিউজ ।

নকশা লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হয়েছে রাজধানীর টিকাটুলিতে অবস্থিত ‘ফ্রেন্ডস টাওয়ার’। নকশায় ১২ তলার অনুমোদন থাকলেও ৩টি ফ্লোর বাড়িয়ে ভবনটি ১৫ তলা করা হয়েছে। গ্রাউন্ড ফ্লোরে পার্কিংস্থলে স্বপ্ন’র শোরুম রয়েছে। রাজউক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত ৭ এপ্রিল রাজউকের প্রস্তুতকৃত পরিদর্শন রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আবাসিক কাম বাণিজ্যিক ১২ তলা ভবন ‘ফ্রেন্ডস টাওয়ার’ এর নকশা অনুমোদন দেয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। যার স্মারক নং রাজউক/নঅঅ৪/৩সি-৪৫৯/২০০৯/৬২৯। ২০১০ এ শুরু করে ২০১৫ সালে ভবনটির কাজ সম্পন্ন করে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ফ্রেন্ডস বিল্ডার্স। রাজউক অনুমোদিত নকশায় ২টি বেইজমেন্টসহ ১২ তলা থাকলেও ভবনটি ২টি বেইজমেন্টসহ ৩টি ফ্লোর বাড়িয়ে ১৫ তলা করা হয়েছে। রাজধানী ২৭ অভয় দাস লেন, টিকাটুলীতে অবস্থিত এই ভবনের জমির মূল মালিক আলহাজ ইঞ্জিনিয়ার মহসিন আহম্মেদ। অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ভবনটি নির্মাণ করে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ফ্রেন্ডস বিল্ডার্স। তবে নকশা প্রণয়নকারী ও নির্মাণ কাজ তদারককারীর নাম নকশায় উল্লেখ নাই। সিভিল এভিয়েশন প্রদত্ত উচ্চতার তথ্যও পায়নি রাজউকের পরিদর্শন টিম।


গত ২৮ মার্চ ঢাকার বনানীর বহুতল ভবন এফআর টাওয়ারে আগুন লেগে অন্তত ২৭ জন নিহত এবং অর্ধ শতাধিক মানুষ আহত হন। এরপর এফআর টাওয়ার নির্মাণে নানা অনিয়মের বিষয়গুলো বেরিয়ে আসতে থাকে। রাজধানীতে নকশা লঙ্ঘন করে নির্মিত ভবনগুলোর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে সরকার। সরেজমিন পরিদর্শনের ভিত্তিতে নকশা লঙ্ঘন করে নির্মিত ভবনের তালিকা প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেয় রাজউককে। জোন-৬ এর আওয়াতাধীন এলাকায় নকশা লঙ্ঘন করে নির্মিত ভবনের তালিকা করতে গিয়ে রাজউকের পরিদর্শন টিম ফ্রেন্ডস টাওয়ার নির্মাণে অনিয়ম খুঁজে পায়। পরিদর্শন টিমের মন্তব্য হচ্ছে-ফ্রেন্ডস টাওয়ারটি ১২ তলার অনুমোদন নিয়ে ১৫ তলা নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও ছাদে কমিউনিটি রুম রয়েছে। গ্রাউন্ড ফ্লোরে পার্কিংস্থলে স্বপ্ন’র শোরুম রয়েছে। অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। কোন অগ্নি নির্গমন সিড়ি নাই।

রাজউকের তথ্য মতে, রাজধানী ঢাকায় নির্মিত আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোর ৬৭ শতাংশেরও বেশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন করা নকশা লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হয়েছে। শুধু আগে নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রেই নকশার লঙ্ঘন হয়নি, বর্তমানে নির্মাণকাজ চলছে এমন ভবনগুলোরও প্রায় ৩০ ভাগ অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণ করা হচ্ছে।

ফ্রেন্ডস টাওয়ারটি ১২ তলার অনুমোদন নিয়ে ১৫ তলা নির্মাণ করা হয়েছে এমন তথ্য আগেই জানা ছিল রাজউকের। যে কারণে সংশ্লিষ্ট জোনের অথরাইজড অফিসার মো. নুরুজ্জামান হোসেন জাহির (স্মারক নং-২৫.৩৯.০০০০.১২২.৩২.২৯২.১৮-৮৫২) ফ্রেন্ডস টাওয়ারের মালিক ইঞ্জিনিয়ার মহসিন আহম্মেদ বরাবর রাজউক অনুমোদিত নক্সা (মঞ্জুরী) দাখিলের নোটিশ দেন। গত ৯ অক্টোবর ২০১৮ইং তারিখে প্রেরিত নোটিশে ৭ (সাত) দিনের মধ্যে রাজউক কর্তৃক অনুমোদিত নকশার ১ ফর্দ অত্র দপ্তরে দাখিল, ব্যর্থতায় ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২ এর সংশ্লিষ্ট ধারায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে মর্মে জানানো হয়। নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হবার পরও নোটিশের জবাব না দেয়ায় ২১ অক্টোবর ২০১৮ইং তারিখে (স্মারক নং-২৫.৩৯.০০০০.১২২.৩২.২৯২.১৮-৫৯৩) ফ্রেন্ডস টাওয়ার কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর আরেকটি নোটিশ দেয়া হয়।


নকশা লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ এবং রাজউকের নোটিশ ও পরিদর্শন টিমের রিপোর্ট এর বিষয়ে জানতে ফ্রেন্ডস টাওয়ারের মালিক আলহাজ ইঞ্জিনিয়ার মহসিন আহম্মেদ এর মোবাইলে (০১৯১৭-৭০৩৩১২) কল করে সাংবাদিক পরিচয় দিলে অপরপ্রান্ত থেকে অস্পষ্ট কিছু একটা বলেই লাইনটি কেটে দেয়া হয়।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৈরি রাজউকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজউকের ৮টি জোনে মোট নির্মাণাধীন ভবন সংখ্যা ৮ হাজার ৭৩০টি। এর মধ্যে লে-আউট নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ২ হাজার ৬০৬টি। অর্থাৎ, প্রায় ৩০ শতাংশ ভবন নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া পৌরসভা ও অন্যান্য দপ্তর থেকে অনুমোদন নিয়ে এক হাজার ৪৮টি ভবন নির্মাণ হচ্ছে। এসব ভবন নকশা মেনে নির্মাণ করা হচ্ছে কি না, সে তথ্য জানা যায়নি।


রাজউকের ৮টি জোনেই পরিচালক, অথরাইজড অফিসার, সহকারী অথরাইজড অফিসার, প্রধান ইমারত পরিদর্শক ও ইমারত পরিদর্শক রয়েছেন। তাদের রুটিন ওয়ার্ক হচ্ছে- নিজ নিজ এলাকায় নতুন ভবনগুলো লে-আউট প্ল্যান অনুযায়ী নির্মিত হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা। অথচ কিছু কিছু কর্মকর্তা তা না করে কেবল নগদ অর্থের বিনিময়ে অবৈধ ফাইলকে বৈধ করছেন। বনিবনা না হলে খুঁটিনাটি ত্রæটি খুঁজে বের করে মাসের পর মাস বৈধ ফাইল আটকে রাখছেন। সাইট ভিজিটে গিয়ে টাকা ছাড়া কোন ইমারত পরিদর্শক রিপোর্ট করেন না বলেও রাজউকে প্রচলিত আছে।

নকশা লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ প্রসঙ্গে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ. ম রেজাউল করিম সময়নিউজকে বলেন, কোনো ভবন হয়ে যাওয়ার পর অবৈধ বলা হবে সেটা হবে না। এর দায়ভার সংশ্লিষ্ট রাজউক কর্মকর্তা ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে। কোনোভাবেই অনুমোদনহীন উর্ধ্বমুখী ভবন থাকবে না। ঢাকায় কোনো অবৈধ ভবন থাকবে না। অনুমোদনহীন ভবনের বৈধতা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাজধানীতে ৯০ হাজার ভবন নির্মাণাধীন জানিয়ে শ ম রেজাউল করিম বলেন, যে এলাকায় অবৈধ ভবন নির্মাণ হচ্ছে বা হবে ওই এলাকায় দায়িত্বরত রাজউকের অফিসারকে এর দায় নিতে হবে। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে- ফ্রেন্ডস টাওয়ারের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করে রাজউক।

নকশা মানছে না ৩০ শতাংশ নির্মাণাধীন ভবনও

রাজউকের করা সর্বশেষ এক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রাজউকের আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গমাইল এলাকার মধ্যে মোট দুই লাখ চার হাজার ১০৬টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালের জুলাই মাসের আগে নির্মাণ করা হয়েছে এক লাখ ৯৫ হাজার ৩৭৬টি। এর মধ্যে এক লাখ ৩১ হাজার ৫৮৩টি ভবনে ইমারত নির্মাণ লঙ্ঘনের চিত্র পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। অর্থাৎ, প্রতি ১০০টি ভবনের মধ্যে ৬৭ দশমিক ৩৫টি ভবনই অনুমোদিত নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। কেবল আগে নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রেই নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ নয়, এখন নির্মাণ করা হচ্ছে এমন আট হাজার ৭৩০টি ভবনের মধ্যে দুই হাজার ৬০৬টিতে বিধি মানা হচ্ছে না। অর্থাৎ, এখন রাজধানীতে যেসব ভবন নির্মাণ হচ্ছে তার মধ্যে শতকরা ২৯ দশমিক ৮৫ ভাগ অনুমোদিত নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার বলেন, রাজউকের এলাকায় বিপুল পরিমাণ ভবন ইমারত আইন লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়েছে। বিভিন্ন সময় এসব ভবনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছি। সম্প্রতি রাজউকের ২৪টি টিম মাঠে নেমে নতুন করে বহুতল ভবনের নকশা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষে প্রতিবেদন রিপোর্ট তৈরি করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রথমে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। পরে তালিকা ধরে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

গত বছরের জুলাই মাসে তৈরি রাজউকের তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, রাজউকের আশুলিয়া-গাজীপুর নিয়ে গঠিতে জোন-১ এ মোট ভবন রয়েছে আট হাজার ৮৭৪টি। রাজউক এরকম ৮টি জোন নিয়ে গঠিত। এরমধ্যে নির্মিত ভবন সংখ্যা আট হাজার ৪১৬ আর নির্মাণাধীন ভবন রয়েছে ৪৫৮টি। উত্তরা, টঙ্গী নিয়ে গঠিত জোন-২ এ রয়েছে ৬০ হাজার ১৩৭টি ভবন। এর মধ্যে নির্মিত ভবন সংখ্যা ৫৭ হাজার ৪০১টি, নির্মাণাধীন দুই হাজার ৭৩৬টি। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, পল্লবী এলাকা নিয়ে গঠিত জোন-৩ এ রয়েছে ৫০ হাজার ১১৯টি ভবন। এর মধ্যে ৪৮ হাজার ৭৯১টি নির্মিত ভবন আর ১ হাজার ৩২৮টি নির্মাণাধীন রয়েছে। গুলশান, বারিধারা, নিকেতন, তেজগাঁও এলাকা নিয়ে গঠিত রাজউকের ৪ নম্বর জোনে ভবন রয়েছে ১৫ হাজার ৭৭২টি। এর মধ্যে নির্মিত ভবন সংখ্যা ১৪ হাজার ৭৮৮টি আর নির্মাণাধীন রয়েছে ৯৮৪টি। ধানমন্ডি-লালমাটিয়া এলাকা নিয়ে গঠিত ৫ নম্বর জোনে রয়েছে ১৭ হাজার ৭১৬টি ভবন। এর মধ্যে নির্মিত ভবন রয়েছে ১৭ হাজার ১৩৮টি আর নির্মাণাধীন রয়েছে ৫৭৮টি। রামপুরা, মতিঝিল ও খিলগাঁও এলাকা নিয়ে গঠিত ৬ নম্বর জোনে মোট ভবন রয়েছে ২১ হাজার ৬৫৬টি। এর মধ্যে নির্মিত ভবন রয়েছে ২১ হাজার ২৪৪টি আর নির্মাণাধীন ভবন হলো ৪১২টি। লালবাগ, সূত্রাপুর, কেরানীগঞ্জ এলাকা নিয়ে গঠিত জোন ৭ নম্বরে রয়েছে ভবন ১০ হাজার ৭০০টি। এর মধ্যে নির্মিত ভবন সংখ্যা ১০ হাজার ১০টি আর নির্মাণাধীন হলো ৬৯০টি। ভুলতা-নারায়ণগঞ্জ এলাকা নিয়ে গঠিত জোন-৮ এ রয়েছে মোট ১৯ হাজার ১৩২টি ভবন। এর মধ্যে নির্মিত ভবন সংখ্যা ১৭ হাজার ৫৮৮টি আর নির্মাণাধীন ১ হাজার ৫৪৪টি।

রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন দেয় এবং সেই লে-আউট প্ল্যান অনুযায়ী ভবন নির্মাণ হয়েছে কি না, তা পর্যক্ষেবণ করে। সেই পর্যবেক্ষণে নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণাধীন ভবন রয়েছে- ১ নম্বর জোনে ৪২৪টি, ২ নম্বর জোনে ৭৮০টি, ৩ নম্বর জোনে ৩২৮টি, ৪ নম্বর জোনে ১০৫টি, ৫ নম্বর জোনে ৫৫টি, ৬ নম্বর জোনে ৩২৯টি, ৭ নম্বর জোনে ২৩৮টি ও ৮ নম্বর জোনে ৩৪৭টি।

এ বিষয়ে রাজউক কর্মকর্তাদের বক্তব্য হচ্ছে- দুই কোটিরও বেশি মানুষের আবাস ও বাণিজ্যিকস্থল ঢাকাসহ রাজউকের কর্মকান্ড বিস্তৃত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর পর্যন্ত। বিদ্যমান জনবল দিয়ে বিশাল আয়তনে নির্মিত ও নির্মাণাধীন ভবনগুলোর কর্মযজ্ঞ পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নকশা মেনে ভবন নির্মিত হচ্ছে কি না বা নির্মিত ভবনে নকশা মানা হয়েছে কি না, তা নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না।