বুধবার ১৩ই নভেম্বর ২০১৯ ভোর ০৫:৪৩:৫৯

Print

গোয়েন্দা নজরে ৫০০ ব্যক্তি


বিশেষ প্রতিনিধি:

প্রকাশিত : শনিবার ২রা নভেম্বর ২০১৯ সকাল ০৯:২১:১৬, আপডেট : বুধবার ১৩ই নভেম্বর ২০১৯ ভোর ০৫:৪৩:৫৯,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ২০১ বার

রাজধানীতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথম ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু করে র‌্যাব। গ্রেপ্তার করা হয় মহানগর যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। তারপর একের পর এক ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালাতে থাকে সংস্থাটি। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানটি একপর্যায়ে দুর্নীতিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়। ক্যাসিনোকান্ডে যুক্ত নয় এমন প্রভাবশালীদেরও গ্রেপ্তার শুরু হয়। র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্বল্পসময়ে বিপুল অর্থের মালিক বনে যাওয়া পাঁচ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। এসব ব্যক্তিকে রাখা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিতে।

এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যেই প্রভাবশালী ২৩ ব্যক্তি ও তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০০ ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে। এর মধ্যে জিকে শামীমের ১৯ ব্যাংকে ১৩২, খালেদের ৮ ব্যাংকে ৭১, কাজী আনিসের ৮ ব্যাংকে ৩৩, লোকমানের ১০ ব্যাংকে ৪০ হিসাব রয়েছে। এসব হিসাবের লেনদেন স্থগিত ও কিছু জব্দ করা হয়েছে। তাদের সম্পদ সম্পর্কে তথ্য জানতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছে দুদক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক। হিসাব জব্দ তালিকায় সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তারা রয়েছেন। রাজনীতিবিদদের বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা।

অভিযান পরিচালনাকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। অভিযান চলমান রাখার নির্দেশনা রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এরই মধ্যে সংবাদসম্মেলনে শুদ্ধি অভিযান চলমান রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।

গত দেড় মাসের অভিযানের পরিসংখ্যান বলছে, এ পর্যন্ত ক্যাসিনো-দুর্নীতিবিরোধী ৪৯টি অভিযান পরিচালনা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এর মধ্যে ৩২টি র‌্যাব এবং ১৭টি পরিচালনা করে পুলিশ। এসব অভিযানে ২৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ২২২ এবং ঢাকার বাইরে ৫৩ জন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে যুবলীগের ৬, আওয়ামী লীগের ২ ও কৃষকলীগের একজন রয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে ১১টি ক্যাসিনো ও ক্লাবে অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে ৮ কোটি ৪৫ লাখ নগদ টাকা, ১৬৬ কোটি টাকার এফডিআর, ১৩২টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই এবং ১১ কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৮ কেজি স্বর্ণ, ২০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এসব গ্রেপ্তারের ঘটনায় দায়ের হওয়া মোট ১১টি মামলার তদন্ত করছে র‌্যাব। ইতোমধ্যে দুটি অস্ত্র মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছে র‌্যাব।

চলমান অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমি মনে করি এটা ওভার ডিউ ছিল। যে কোনো কারণেই হোক প্রধানমন্ত্রী এখন এটা করছেন। নিশ্চয়ই এটা স্বাগত জানানোর মতো। এখানে অনেক বিষয় বেরিয়ে আসছে। রাজনৈতিক বড় বিষয় চলে আসছে। এ ধরনের মানুষ রাজনীতিতে কীভাবে আসে? রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তারা কীভাবে ফায়দা হাসিল করে, যাদের ন্যূনতম আদর্শ নেই। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন বেশ ভালো নেতারা। রাজনীতির ভেতরে যারা দুর্বৃত্তায়নে সহযোগিতা করেছে বা করছে তাদের রাজনীতি থেকে বিসর্জন দিতে হবে। সেটা সব পার্টির জন্য প্রযোজ্য। যতই বলা হোক অনুপ্রবেশকারী। অনুপ্রবেশ তো কারও না কারও মাধ্যমে করেছে। তাদের বিরুদ্ধে যদি ক্ষমতাসীন দল অ্যাকশন নেয় সেটা অন্য সব পার্টির জন্য একটা সবক হবে।

তিনি আরও বলেন, এখন আমরা দেখছি কয়েকজন এমপির নাম আসছে। এ ছাড়া ঢাকার উত্তর দক্ষিণের কাউন্সিলরদের গ্রেপ্তারের পর ওই ওয়ার্ডের মানুষদের যে উল্লাস, মিষ্টি বিতরণ, স্বস্তি প্রকাশ এতেই বোঝা যায় তাদের কোনো জনপ্রিয়তা ছিল না। অথচ তারা পার্টির মনোনয়ন পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ে গোপন ব্যালটে ভোটের মাধ্যমে মনোনয়ন দেওয়া যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্যাসিনো-দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর পর অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বেরিয়ে আসছে। তাদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। এ তালিকায় সংসদ সদস্য, ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও সরকারি কর্মকর্তারা রয়েছেন। আজ শনিবার চলমান অভিযানের ৪৫ দিন অর্থাৎ দেড় মাস পূর্ণ হচ্ছে।

অভিযান পরিচালনাকারী সূত্র জানায়, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর সাধারণ মানুষ নিজ থেকেই অভিযান সংশ্লিষ্টদের অনেক অনিয়ম-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের তথ্য দিয়ে সহায়তা করছেন। স্থানীয় জনতার দেওয়া তথ্য নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর পর অনেক ক্ষেত্রেই তার সত্যতাও মিলছে। সাধারণ মানুষ নিজ থেকে আগ্রহী হয়ে তথ্য প্রদানের এ প্রবণতাকে অভিযানের ‘সাফল্য’ এবং ‘জনপ্রিয়তা’ হিসেবে দেখছেন অভিযান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

চলমান অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেসন্স) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার বলেন, ‘অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক তৌহিদুল হক এ বিষয়ে বলেন, এ অভিযানকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এ অভিযানে জনগণ এক ধরনের ধাক্কা খেয়েছেন। কারণ সমাজের অনেকের চরিত্র আমরা যেভাবে জানতাম পর্দার অন্তরালে তারা সেভাবে কাজ করেনি। গ্রেপ্তারের পর তাদের ভিন্ন চেহারা বেরিয়ে আসছে। প্রায় সব ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার যে দৃশ্যমান দাপট রয়েছে সেটি স্পষ্ট হচ্ছে। রাজনীতিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা ও সাংবাদিক তিন ধরনের মানুষকে ‘ম্যানেজ’ না করে অপরাধ করা মুশকিল সেটিও বোঝা যাচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা এমন অপরাধ করছেন তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। আমরা মনে করি এ অভিযানের মধ্য দিয়ে সমাজ, রাষ্ট্র, সরকার এবং জনগণ এ চারটি উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করবে।’

অপরদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের পাশাপাশি অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে দুদক। গত ৩০ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানী দল প্রথমে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলেও দিনে দিনে এ তালিকা বাড়ছে। দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন। দুদকে ১০০ জনের বেশি বিতর্কিত ব্যক্তির অভিযোগ যাচাই-বাছাই চলছে। এর মধ্যে ৭৫ জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে।

এ ছাড়া চলমান শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ার পর দুদক অবৈধ সম্পদের যে অনুসন্ধান শুরু করেছে, তার অংশ হিসেবে ভোলা ৩ আসনের সাংসদ নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, চট্টগ্রামের সাংসদ ও জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরী এবং সুনামগঞ্জ-১ আসনের সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন রতনসহ ২৩ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সংস্থাটি। এর পর গত বুধবার আরও ১১ জনের বিদেশযাত্রা রহিত করতে চিঠি দেয়। এ ছাড়া দুদকে আসা অভিযোগ শেষে ৯টি মামলা দায়ের করেছে কর্তৃপক্ষ।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর প্রথম দিনই রাজধানীর ফকিরাপুলের ইয়াংমেনস ক্লাবে অভিযান চালানো হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় গুলশানের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। এর পর একে একে গ্রেপ্তার করা হয় যুবলীগ নেতা এসএম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জিকে শামীম, মো. লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, সম্রাটের সহযোগী এনামুল হক আরমান, মোহাম্মদ শফিকুল আলম ফিরোজ, অনলাইন ক্যাসিনোর প্রধান সমন্বয়কারী সেলিম প্রধান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ও তারেকুজ্জামান রাজীব, কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জুসহ অনেককে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা ময়নুল হক মঞ্জুকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।