শনিবার ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৯ সকাল ০৬:২৬:০৬

Print Friendly and PDF

দেবর-ভাবির সমঝোতা


নিজস্ব প্রতিবেদক:

প্রকাশিত : সোমবার ৯ই সেপ্টেম্বর ২০১৯ সকাল ১১:৩৪:৩২, আপডেট : শনিবার ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৯ সকাল ০৬:২৬:০৬,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ৬২ বার

জাতীয় পার্টির (জাপা) দুই শীর্ষ নেতা অবশেষে সমঝোতায় পৌঁছেছেন। সমঝোতার অংশ হিসেবে জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্বে থাকবেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ। তবে কৌতূহলী সবার প্রশ্ন-কার পরামর্শে এ সমঝোতা? কারা এর নেপথ্যে কাজ করেছেন?

জানা গেছে, সরকার ও বিদেশি বন্ধুদের পরামর্শেই এ সমঝোতা হয়েছে। গত শনিবার দুপুর পর্যন্ত দুই নেতাই নিজ নিজ অবস্থানে অটল ছিলেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে

যেতে থাকে দৃশ্যপট। রওশন এরশাদ তার পূর্বনির্ধারিত শনিবারের বৈঠক স্থগিতের ঘোষণা দেন। অন্যদিকে জিএম কাদেরের বক্তব্যের ভাষা বদলে যায়। সন্ধ্যার পরই বরফ গলতে শুরু করে। প্রথমে উড়ো খবর আসে, সমঝোতা করতে বৈঠকে বসেছেন রওশন-কাদের ও তাদের অনুসারীরা। বৈঠক শেষে গণমাধ্যমের কাছে নাম প্রকাশ করেই বক্তব্য দেন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

প্রশ্নের অবসান ঘটান দলটির নীতিনির্ধারণীয় পর্যায়ের একাধিক নেতা। তারা জানান, জাতীয় পার্টির সুহৃদ বিদেশি কূটনৈতিক ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা রওশন ও কাদেরকে বসে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে বলেন। এমন পরামর্শে নিজেদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের কথা ভেবে সমঝোতার বৈঠকে বসেন।

জাপার অন্য এক নেতা জানান, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতার সঙ্গে পৃথকভাবে দেখা করেন রওশন এরশাদ ও জিএম কাদের। জাপার সিদ্ধান্ত কী হবে, তা আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে আলোচনাকালেই নির্ধারিত হয়ে যায়; বারিধারার ক্লাবে শুধু আনুষ্ঠানিকতা হয়েছে।

এই কথার কোনো সত্যতা নেই বলে মনে করেন জাপার মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। তিনি গতকাল রবিবার দুপুরে বনানীতে দলের চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোটের হয়ে নির্বাচন করেছি। তাই দলটির নেতাদের সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়া থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আছেও। তবে আমাদের দলীয় সিদ্ধান্তে কোনো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা অন্য কারও হাত নেই।

রাঙ্গার দাবি, জাতীয় পার্টি বড় ধরনের ভাঙন থেকে রক্ষা করার জন্য আমিই জাপার দুই শীর্ষ নেতাকে নিয়ে বসি। অনেকের ধারণা, আমি নিরাপদ দূরত্বে ছিলাম। কেউ কেউ তো ফেসবুকে আমার হারিয়ে যাওয়ার বিজ্ঞপ্তিও দিয়ে বসেন। আসলে আড়ালে থেকে দুজনকে একসঙ্গে বসিয়ে সমাধানের কথাই আমি ভাবছিলাম।

সংবাদ সম্মেলনে রাঙ্গা রাতের বৈঠকের সিদ্ধান্তের বিষয়ে বলেন, রওশন এরশাদ হবেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা, জিএম কাদের থাকবেন দলের চেয়ারম্যান হিসেবে। আর রংপুর-৩ উপনির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থিতার বিষয়ে পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব হিসেবে বসে সিদ্ধান্ত নেবেন। গতকালের আলোচনায় সাদের পক্ষে ও বিপক্ষে আলোচনা হয়েছে বলে জানান। এ সময় তিনি অন্য কোনো প্রার্থীর নাম উল্লেখ করেননি। এতে জাপার অনেক নেতা অনুমান করছেন, রাঙ্গার সমর্থন সাদের দিকেই।

রাঙ্গা জানান, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনের বিষয়ে আগের চিঠি প্রত্যাহার করে রবিবার বিকালে পার্টির পক্ষ থেকে স্পিকারকে চিঠি দেওয়া হতে পারে। বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনের পর সংসদে তাদের উপনেতা ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নির্ধারণও করা হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে গতকাল সংসদ চলাকালীন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী স্পিকারের দপ্তরে একটি চিঠি দেন। অবশ্য ওই চিঠিতে কী লেখা আছে তা এ প্রতিবেদন লেখার আগ পর্যন্ত জানা যায়নি। গতকাল রবিবার সংসদ চলাকালীন অবশ্য রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতার চেয়ারে বসতে দেখা গেছে। তবে সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তাকে সংসদ সদস্য বলেই সম্বোধন করেন।

এদিকে রাঙ্গার সংবাদ সম্মেলন শেষ হতে না হতেই জাপার কিছু নেতা বনানী অফিসে হইচই ও স্লোগান দিতে শুরু করেন। এ সময় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সমঝোতা বৈঠককে ‘অগণতান্ত্রিক ও আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত’ বলেও অনেকে উল্লেখ করেন। তাদের স্লোগানে ছিল-‘অগণতান্ত্রিক সমঝোতা মানি না, মানব না’; ‘আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত মানি না, মানব না’; ‘লড়াই না সংগ্রাম সংগ্রাম, সংগ্রাম’; ‘জিএম কাদেরের সৈনিকরা ভয় নাই, ভয় নাই’।

ওই বিক্ষোভে থাকা তেজগাঁও থানা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি আলী হোসেন বলেন, নেতা ঠিক করতে না পারলে আমাদের ভগ্নপ্রায় তৃণমূল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব নাটকের কারণে জনগণও আমাদের দেখে হাসে। এবার রওশন এরশাদকে নিয়ে যে নাটক হলো আমরা এটা চাই না। যিনি চেয়ারম্যান, তিনিই সংসদে নেতা হবেন, এটাই কথা। আলাদা আলাদা নেতা চাই না।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ বিষয়ে গত দুই দিন একাধিক আলোচনায় বলেছেন, জাতীয় পার্টির বিষয়ে আওয়ামী লীগের মাথাব্যথা নেই। তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়ে কোনো ভূমিকাই রাখবে না আওয়ামী লীগ। তিনি মনে করেন জাপা পৃথক একটি রাজনৈতিক দল; তাদের বিষয়ে কেবল তারাই সিদ্ধান্ত নেবে। সেখানে আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো ভূমিকা থাকতে পারে না।

গত মঙ্গলবার বিকালে জিএম কাদেরকে বিরোধী দলের নেতা করতে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে চিঠি দেওয়া হয়। এর এক দিন পর গত বুধবার বিকালে জিএম কাদেরের ওই সিদ্ধান্তকে আমলে না নেওয়ার সুপারিশ করে পাল্টা চিঠি দেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ। এর পর থেকেই মূলত দলের ভেতরে দ্বন্দ্বের বিষয়টি ছড়িয়ে যায়। জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সংরক্ষিত সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যরাও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছিলেন। পরে বৃহস্পতিবার রওশন এরশাদ তার গুলশানের বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। সংবাদ সম্মেলনে রওশন এরশাদকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। ওইদিনই পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে জবাব দেন জিএম কাদের। রওশন এরশাদের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া জাপা নেতাদের বক্তব্যকে দলের গঠনতন্ত্রবিরোধী বলে আখ্যা দেন।