শুক্রবার ২২শে নভেম্বর ২০১৯ সকাল ১০:৫৮:৪০

Print

জনতার কাউন্সিলরের কাজ ছিল চাঁদাবাজি-দখলবাজি


বিশেষ প্রতিবেদক:

প্রকাশিত : সোমবার ২১শে অক্টোবর ২০১৯ সকাল ১০:৪৭:১৩, আপডেট : শুক্রবার ২২শে নভেম্বর ২০১৯ সকাল ১০:৫৮:৪০,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪১০ বার

মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক দুটি মামলা করে র‌্যাব। গত রাতে তাকে আদালতে নিয়ে দুই মামলায় ১০ দিন করে ২০ দিনের রিমান্ড চায় ভাটারা থানা পুলিশ। মামলার শুনানি শেষে দুই মামলায় ৭ দিন করে ১৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট বেগম ইয়াসমিন আরা। রাত সোয়া ১২টার দিকে এ শুনানি হয়।

রাজীব ছিলেন ধূর্ত প্রকৃতির। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে আঞ্চলিকতাকে সুচতুরভাবে ব্যবহার করেন তিনি। ঢাকার বুকে একখন্ড ভোলা হিসেবে খ্যাত মোহাম্মদপুরের নতুন এলাকা। শিয়া মসজিদের পর মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি, নবোদয়, চাঁনমিয়া হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, কাঁটাসুর আর বেড়িবাঁধে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগের বাড়ি দ্বীপজেলা ভোলায়। আঞ্চলিকতার সুবাদে ২০১৪ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ওই এলাকায় (৩৩ নম্বর ওয়ার্ড) আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে বিপুল ভোটে কাউন্সিলর পদে জয়ী হন তারেকুজ্জামান রাজীব।

পোস্টার করে নিজের নামের সঙ্গে ‘জনতার কাউন্সিলর’ খেতাব জুড়ে দেন তিনি; কিন্তু কয়েক মাসের মাথায় জনতার কাতার থেকে সরে গণপরিবহনে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ইয়াবাকারবারে জড়িয়ে পড়েন তারেকুজ্জামান রাজীব। জবরদখল করেন তার ভোটব্যাংক ভোলার মানুষের প্লটও। চলাফেরার সময় সঙ্গে রাখতেন ২০-২৫ অস্ত্রধারী। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা পাইন আহমেদকে মারধর করে ২০১৫ সালে আলোচনায় আসেন তিনি।

এ কাণ্ড প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কান অবধি পৌঁছার পর মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয় রাজীবকে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগেরই এক শীর্ষপর্যায়ের নেতার সুপারিশে তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। বরং গত মার্চে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন রাজীব। অভিযোগ রয়েছে-সদ্য বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান আনিস এবং মহানগর উত্তরের এক নেতাকে এক কোটি টাকা দিয়ে পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি।

স্থানীয়রা বলেছেন, রাজমিস্ত্রির ছেলে রাজীব ৭ বছর আগেও মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির একটি বাড়িতে এক রুমের ভাড়া বাসায় থাকতেন। ভাড়া দিতেন ৬ হাজার টাকা। এখন ওই হাউজিংয়েই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি। মোহাম্মদপুরে তার অন্তত ছয়টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। মাত্র সাড়ে চার বছরে এখন তিনি শতকোটি টাকার মালিক। অবৈধভাবে অঢেল অর্থ কামানোর পর সৌদি যুবরাজের আদলে রাজকীয় সাজ-পোশাকে ফ্যাশনদুরস্ত হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন এবং বাদশাহী মেজাজে চলাফেরা করতে শুরু করেন রাজীব। কিছুদিন পর পর গাড়ি বদলানোর বাতিক রয়েছে তার।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজীবের গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহন উপজেলার বদরপুর ইউনিয়নে। হাফিজ হাওলাদার নামে তাদের এক পূর্বপুরুষ এক সময় চেয়ারম্যান ছিলেন বদরপুর ইউনিয়নে; কিন্তু জমিজমা বিক্রি করে এক সময় অভাবে পড়ে রাজীবদের পরিবার। এ অবস্থায় রাজীবের বাবা তোতা মিয়া হাওলাদার তার তিন ছেলেকে নিয়ে মোহাম্মদপুরে একটি টিনশেড বাসায় ভাড়া ওঠেন। তখন তোতা মিয়া রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন ভাই ইয়াসিন হাওলাদারের ঠিকাদারি কাজে। আর রাজীবসহ অপর ছেলেদের কাজ দেন মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন দোকানে।

তবে রাজীবের চাচা ইয়াসিন হাওলাদার তার ‘হাওলাদার বিল্ডার্স’ নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। মোহাম্মদপুর আওয়ামী লীগের সমর্থক ইয়াসিন হাওলাদার ২০০৯ সালের সংসদ নির্বাচনে জাহাঙ্গীর কবির নানকের পক্ষে এলাকা চষে বেড়ান। ওই নির্বাচনে তিনি দলের পক্ষে অর্থ-সময় ব্যয়ও করেন। আর নির্বাচনের পর নানক স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী হন। এর পর ইয়াসিন হাওলাদারের ভাতিজা হিসেবে মন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় এবং তার আশীর্বাদপুষ্ট হন রাজীব। মন্ত্রীর ছেলের (সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত) সঙ্গে সখ্য গড়ে মন্ত্রীকে বাবা ডাকেন। এর পর যুবলীগকর্মী থেকে গোটা মোহাম্মদপুরের নেতা হন যুবক রাজীব।

এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, নানক মন্ত্রী থাকাকালে মোহাম্মদপুরের বসিলায় তৃতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু উদ্বোধন হয়। সেতুতে চলাচলের সুবিধার্থে আল্লাহ করিম মসজিদ থেকে সোজা চওড়া সড়ক নির্মাণ করা হয়। ওই সময় বাড়ি অধিগ্রহণের নামে বাড়িওয়ালাদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে রাজীবের অর্থবিত্ত ও প্রভাবের শুরু। এর পর নূরজাহান রোড ও সলিমুল্লাহ রোডের মাথা থেকে বাসস্ট্যান্ড সরিয়ে নেন কাঁটাসুর-বেড়িবাঁধ তিনরাস্তা সড়কে। গণপরিবহনে চাঁদাবাজির দখল চলে যায় রাজীবের হাতে। গঠন করেন বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী। এতে শাহ আলম জীবন, রাজীবের গ্রামের সিএনজি কামাল ওরফে লোকাই কামাল, আশিকুজ্জামান রনি, ফারুকসহ অর্ধশতাধিক ক্যাডার রয়েছে।

মোহাম্মদপুর তিনরাস্তা বেড়িবাঁধে সিএনজি অটোরিকশা চলাচলে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি চাঁদা আদায় করে আসছে সিএনজি কামাল। মোহাম্মদপুর, বেড়িবাঁধ, বসিলা এলাকার পরিবহনে চাঁদাবাজি রাজীবের নিয়ন্ত্রণে। অটোরিকশা, লেগুনা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও বাস থেকে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তোলে তার লোকজন। পাঁচ বছর ধরে এলাকার কোরবানির পশুর হাটের ইজারাও নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন রাজীব।

রাজীব স্ত্রীর বড় ভাই ইমতিহান হোসেন ইমতিকে দিয়ে আল্লাহ করিম মসজিদ উন্নয়নের নামে ১৫৭টি দোকানের মালিকের কাছ থেকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা নিয়েছেন। কামাল ও জীবনের নিয়ন্ত্রণে মোহাম্মদপুর তিনরাস্তায় রমরমা ইয়াবাকারবার।

অভিযোগ রয়েছে-রহিম ব্যাপারীঘাট মসজিদের সামনে আবদুুল হক নামের এক ব্যক্তির ৩৫ কাঠার একটি প্লট যুবলীগের কার্যালয়ের নামে দখল করেছেন রাজীব। এর আগে ওই জমির পাশেই জাকির হোসেনের সাত-আট কাঠার একটি প্লট দখল করে রেখেছিলেন তিনি। পরে রাজীবকে মোটা অঙ্কের টাকা বখরা দিয়ে সেই জমি দখলমুক্ত করতে হয়েছে। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশের ময়ূর ভিলার মালিক রফিক মিয়ার কয়েক কোটি টাকা দামের জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে রাজীব ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে। পাবলিক টয়লেট নির্মাণের মাধ্যমে জমিটি দখল করা হয়। সেখানে পাঁচটি দোকান তুলে ভাড়া দিয়ে টাকা নিচ্ছে তারা। ঢাকা রিয়েল এস্টেটের ৩ নম্বর সড়কের ৫৬ নম্বর প্লট, চাঁদ উদ্যানের ৩ নম্বর রোডের রহিমা আক্তার রাহি, বাবুল ও মো. জসিমের তিনটি প্লটসহ অন্তত দশটি প্লট দখল করেছেন মোহাম্মদপুরের চাঁদাবাজির এই হোতা।

গতকাল রাজধানীর ভাটারা থানায় রাজীবের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক দুটি মামলা করেছে র‌্যাব। এর পর সন্ধ্যায় তাকে ভাটারা থানাপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এ বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে রাজীবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম চালানো হবে।

গত শনিবার রাতে ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরার একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তারের পর রাজীবকে নিয়ে তার মোহাম্মদপুরের বাসায় ও কার্যালয়ে অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় বাসা থেকে ৭টি বিদেশি মদের বোতল, একটি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, তিন রাউন্ড গুলি, নগদ ৩৩ হাজার টাকা ও একটি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়।