শুক্রবার ১৫ই নভেম্বর ২০১৯ ভোর ০৪:০৭:২৩

Print

আমি এই এলাকার ডিসি, ম্যাজিস্ট্রেটনিজেকে রাজা ভাবতেন কাউন্সিলর মঞ্জু


বিশেষ সংবাদদাতা:

প্রকাশিত : শনিবার ২রা নভেম্বর ২০১৯ সকাল ১০:০৫:৫৫, আপডেট : শুক্রবার ১৫ই নভেম্বর ২০১৯ ভোর ০৪:০৭:২৩,
সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩০৩ বার

কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু। ফাইল ছবি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু। ওয়ারী থানার একটি চাঁদাবাজির মামলার সূত্র ধরে বৃহস্পতিবার নিজ কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তাকে গ্রেফতারের পর থেকেই বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

কাউন্সিলর মঞ্জু রাজধানী সুপার মার্কেটকে বানিয়েছিলেন তাঁর টাকার খনি। কোনো ব্যবসায়ী দোকানে কোনো আইটেম পরিবর্তন করলেও মনজুকে দিতে হতো দুই লাখ টাকা চাঁদা। আর জেনারেটর বাণিজ্য করতে লোডশেডিং না হলেও মার্কেটের বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিতেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় কাউন্সিলর ও সরকারি দলের রাজনীতি করায় নিজেকে ওই এলাকার রাজা ভাবতেন মনজু। তাঁর বিরুদ্ধে র‌্যাব-পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করলেও পাত্তা দিতেন না মনজু। তিনি বলে বেড়াতেন, ‘আমি এই এলাকার ডিসি, ম্যাজিস্ট্রেট সব। আমার বিষয়ে কিছু জানতে হলে আমার কাছে আসতে হয়। আমি কারো কাছে যাই না।’
র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল শফিউল্লাহ বুলবুল জানান, কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জুর বিরুদ্ধে অবৈধ দখলদারি, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও জুয়ার আসর পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। গ্রেফতারের সময় তার কার্যালয় থেকে আমেরিকার তৈরি একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, চার রাউন্ড গুলি, একটি খেলনা স্টিলের পিস্তল, ৬২০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, পাঁচ বোতল মদ ও ১২ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়েছে।

কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জুর বিরুদ্ধে রাজধানী সুপার মার্কেট ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেট থেকে মাসে কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মঞ্জুর ক্যাডার বাহিনী কে এম দাস লেন, অভয় দাস লেন, টয়েনবী সার্কুলার রোড, জয়কালী মন্দির রোড, ভগবতী ব্যানার্জি রোড, ফোল্ডার স্ট্রিট, হাটখোলা রোড এবং আর কে মিশন রোড এলাকার ফুটপাথ ও খালি জায়গায় দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি করে। এসব এলাকা থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নামেও চাঁদা তোলে মঞ্জুর লোকজন।

কাউন্সিলর ছাড়াও মঞ্জু বাংলাদেশ বয়েজ ক্লাবের সভাপতি। টিকাটুলীর এই ক্লাবেও জুয়ার বোর্ড চালানোর অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জানা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ২০১১ সাল থেকে টানা আট বছর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের আওতাধীন টিকাটুলীর ওই মার্কেটের ‘স্বঘোষিত’ সভাপতি তিনি। দুই মার্কেটের ১ হাজার ৭৮৮টি দোকান থেকে বিভিন্ন খাত দেখিয়ে প্রতি মাসে ৯৫০ টাকা করে আদায় করা হতো।

কোনো ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে না চাইলে তার দোকানে তালা ঝোলাত মঞ্জুর লোকজন। প্রতিবাদ করায় হুমকি পেয়ে ব্যবসায়ী আজমল হোসেন, হাফিজুর রহমান, ফজলুল হক, সেন্টু চৌধুরী, আবু বকর ও মতিউর রহমান ওয়ারী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। এর বাইরে ঈদে বা পূজায় মঞ্জুকে দিতে হতো বাড়তি টাকা। জেনারেটর, বেয়ারসহ অন্যান্য খরচের নামেও দিতে হতো চাঁদা। তার বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও র‌্যাব সদর দফতরসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক অভিযোগও করেন। মঞ্জুর কথার অবাধ্য হলেই ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ধরে নিয়ে টর্চার সেলে নির্যাতন করা হতো।

চাঁদাবাজির সময় হাতেনাতে কয়েক দফায় তার লোকজন গ্রেফতারও হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মার্কেটে চাঁদাবাজি বন্ধে নির্দেশনা দেওয়ার পরও তা মানা হয়নি। সম্প্রতি এক চিঠিতে রাজধানী সুপার মার্কেট ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটের দোতলায় পাইপ ও লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে ৮৪টি দোকান করার অনুমতি দেয় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট। এর পরই মঞ্জুর লোকজন ওই সব দোকানের জামানত নির্ধারণ করে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা করে। মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এ সুযোগে মঞ্জু প্রতিটি দোকান থেকে ৮-১০ লাখ টাকা অগ্রিম নিয়েছেন। মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, সম্প্রতি মঞ্জুর চেষ্টায় মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে রাজধানী সুপার মার্কেট ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটে লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে প্রতিটি ৩৫ বর্গফুট আয়তনের দোকান নির্মাণের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। চিঠির শর্তে বলা হয়েছে, দোকানগুলো বরাদ্দ নয়, ভাড়া দেওয়া হবে। দোকানের নামজারি দেওয়া হবে না এবং ভাড়া দেওয়ায় দোকানির কোনো স্বত্বও জন্মাবে না। প্রতিটি দোকানের মাসে ভাড়া হবে ২ হাজার টাকা।

আগস্টে এই চিঠি পাওয়ার পর মঞ্জু প্রতিটি দোকান ভাড়ার অগ্রিম বাবদ ৮-১০ লাখ টাকা করে আদায় করতে শুরু করেন। ইতিমধ্যে তিনি বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অগ্রিম নিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার ঘোষিত বিদ্যুৎ বিল প্রতি ইউনিট ১০ টাকা। কিন্তু প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে দিতে হয় ১৩ টাকা ৫০ পয়সা। প্রতি মাসে ৮-১০ লাখ টাকা শুধু বিদ্যুৎ থেকেই চাঁদাবাজি করতেন মঞ্জু। জানা গেছে, অবৈধভাবে মঞ্জু ১১০টি দোকান বিক্রি করেন। প্রতিটির দাম ১০ লাখ টাকা। এ বাবদ তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন ১০ কোটি টাকার বেশি।

এ ছাড়া টিকাটুলীর ১২ কে এম দাস লেনের ৭ বিঘা ১৬ কাঠা সম্পত্তির ওপর নজর পড়ে মঞ্জুর। এই সম্পত্তি রক্ষার দাবিতে ইতিপূর্বে সংবাদ সম্মেলন করেছে শ্রীশ্রী স্বামী ভোলানন্দগিরি আশ্রম ট্রাস্ট। এর ট্রাস্টিরা জানান, ওই জমিতে শ্রীশ্রী স্বামী ভোলানন্দগিরি আশ্রম কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হয়। সনাতন ধর্ম চর্চার উদ্দেশ্যে স্বর্গীয় যোগেশ চন্দ্র দাস ও তার ছোট ভাই স্বর্গীয় শচীন চন্দ্র দাস ২০১২ সালের ২৩ জুন ৩৬৩৪ নম্বর রেজিস্ট্রিযুক্ত দলিলে এই জমি দান করেন। আশ্রমের শতকোটি টাকা মূল্যের জমি মঞ্জুসহ প্রভাবশালী একটি মহলের যোগসাজশে কিছু অংশ জবরদখল হয়ে আছে। এ বিষয়ে ১৯ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলাও হয়েছে।

এসব ব্যাপারে র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফিউল্লাহ বুলবুল গণমাধ্যমকে বলেন, তাঁকে গ্রেফতারের পর অনেকে অভিযোগ নিয়ে আসছেন। আগে তাঁরা অভিযোগ করতে ভয় পেতেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওয়ারী থানায় দুটি মামলা হয়েছে। মামলা দুটি তদন্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হবে। যদি মামলা আমরা পাই, তাহলে তাঁর অপরাধ জগৎ ও সহযোগীদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

ওয়ারী থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর হারুনুর রশীদ বলেন, আমরা তাঁকে রিমান্ডে পেয়েছি। এখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর তিনি বাড়ি দখল করেছেন এমন খবর শোনা যাচ্ছে। তবে এখনো এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া আমরা অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলা তদন্ত করছি। ফলে বাড়ির বিষয়টি আমরা দেখছি না।