স্ত্রীর নগ্ন ভিডিও ধারণ, পরকীয়ার মিথ্যা স্বীকরোক্তি
প্রকাশিত:
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৬:৩০
আপডেট:
৪ এপ্রিল ২০২৫ ১৯:১২

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় স্বামী ইয়াসিন আকন প্রথমে স্ত্রীকে বিবস্ত্র করে নগ্ন ভিডিও ধারণ করে সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক পরকীয়ার মিথ্যা স্বীকরোক্তি আদায় করে তা রেকর্ড করেন। এরপরই শুরু করেন শারীরিক নির্যাতন। পা থেকে মাথা পর্যন্ত স্ত্রী মিম আক্তারের (১৮) শরীরের কোথাও মারতে বাদ রাখেননি স্বামী। কালো ছোপ ছোপ দাগ তার সমস্ত শরীরে।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এমন বীভৎষ নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন নির্যাতিতা কিশোরী বধূ। নির্যাতনের দুদিন পর শশুর বাড়ির লোকজনকে ফোন করে তাদের মেয়েকে নিয়ে যেতে বেলন ইয়াসিন। পরে পরিবারের লোকজন শুক্রবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাতে স্বমীর বাড়ি থেকে মিমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। মধ্যযুগীয় বর্বরতার এই ঘটনাটি ঘটেছে গত বুধবার (২১ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা ইউনিয়নের উত্তর রাজাপুর গ্রামে।
নির্যাতনের শিকার মিম আক্তার ও তার পরিবারের সদস্যরা জানান, উপজেলার ১ নম্বর ধানসাগর ইউনিয়নের মালের বেপারীর মেয়ে মিম আক্তারের সঙ্গে ৩ নম্বর রায়েন্দা ইউনিয়নের উত্তর রাজাপুর গ্রামের সুলতান আকনের ছেলে ইয়াসিন আকন (২৮) প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এই সম্পর্ক মেনে নেয়নি মিমের পরিবার। একপর্যায়ে সম্পর্কের ১১ মাসের মাথায় ২০১৯ সালের ১৬ অক্টোবর পরিবারের অমতে পালিয়ে ইয়াসিনকে বিয়ে করেন মিম। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকর দাবি করে আসছিলেন ইয়াসিন। তার দাবিকৃত দুই লাখ টাকা না দেওয়ায় পরকীয়ার মিথ্যা অভিযোগ তুলে এই নির্যাতন করা হয়েছে।
শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন মিম আক্তার ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, তিন বছর আগে প্রেম করে পরিবারের অমতে ইয়াসিনকে বিয়ে করেন। তার স্বামী কার্গো জাহাজে (লাইটার জাহাজ) চাকরি করে। সে কারণে দুই-তিন মাস পর পর বাড়িতে আসে। বাড়িতে এসেই ব্যাংকে তার নামে বাবার জমা রাখা দুই লাখ টাকা দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে শারীরিক নির্যাতন করতো। ঘটনার দিন বুধবার (২১ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ৪টার দিকে জাহাজ থেকে বাড়িতে আসে। ওই রাতে এসেই তার বিরুদ্ধে পরকীয়ার মিথ্যা অভিযোগ তোলে। এরপর তাকে বিবস্ত্র করে তা মোবাইলে ভিডিও করে। সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তার মুখ থেকে জোরপূর্বক পরকীয়ার স্বীকারোক্তি আদায় করে তা রেকর্ড করে।
সবকিছু ভিডিও করার পর ইয়াসিন (স্বামী) মিমকে কিল, ঘুষি, লাথি মারতে থাকে। একপর্যায়ে মোটা দড়ি দিয়ে চাবুক বানিয়ে তা দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে পেটাতে থাকে। চিৎকার করলে তার মুখের মধ্যে ওড়না ঢুকিয়ে দেয়। একপর্যায়ে তার গলায় ওড়না পেচিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। তার শরীরের সমস্ত জায়গায় রক্ত জমাট বেধে গেছে। এ অবস্থায় তাকে চিকিৎসা না করিয়ে আটকে রাখে। তার নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দুদিন পরে তার মা-বাবাকে ফোন করে নিয়ে যেতে বলে। পরে তারা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে হাসপতালে ভর্তি করেন। তার স্বামীর সঙ্গে তার প্রবাসী ভাইয়ের স্ত্রীর পরকীয়ার সম্পর্ক আছে। সেই দোষ ঢাকতে উল্টো তার নামে পরকীয়ার অভিযোগ করছে। তার সমস্ত শরীরে প্রচন্ড যন্ত্রনা হচ্ছে। মিম এমন স্বামীর সংসার করতে অস্বীকার জানিয়ে এই নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
মিমের বাবা আ. মালেক বেপারী জানান, তারা আগে থেকেই ইয়াসিনের স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে জানেন। সেকারণেই ওর সঙ্গে বিয়েতে রাজি ছিলেন না। বিয়ের আগেই মেয়ের নামে দুই লাখ টাকা ব্যাংকে রেখেছিলেন। সেটা জানতে পেরে ইয়াসিন সেই টাকা চেয়ে মেয়েকে বার বার নির্যাতন করে চলেছে। এঘটনায় মামলা করা হবে।
শরণখোলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. ববি সাহা জানান, মিমের শরীরে বিভিন্ন স্থানে রক্ত জমাট বাধাসহ মারাত্মক আঘাতে চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
মিমের স্বামী মো. ইয়াসিন আকনের কাছে জানতে চাইলে স্ত্রীকে মারধর ও নির্যাতনের কথা স্বীকার করে জানান, তার স্ত্রী অন্য এক ছেলের সঙ্গে পরকীয়া করে। তার কাছে সে স্বীকার করেছে পরকীয়ার কথা। তবে তার বিরুদ্ধে যৌতুক এবং ভাবির সঙ্গে পরকীয়ার যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকরাম হোসেন জানান, মিম আক্তারকে নির্যাতনের মৌখিক অভিযোগ পেয়েছেন। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সম্পর্কিত বিষয়:
নারী নির্যাতন
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: