ঢাকা মঙ্গলবার, ৪ঠা আগস্ট ২০২০, ২১শে শ্রাবণ ১৪২৭


কুষ্টিয়ার জেল সুপারসহ ৩৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

২২ মাস আগে দায়িত্বে থাকা জেলারের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ!


প্রকাশিত:
২২ জুলাই ২০২০ ১১:০১

আপডেট:
২২ জুলাই ২০২০ ১৮:৩২

ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি কুষ্টিয়া কারাগারের নানা অনিয়মের তদন্ত করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। ওই কারাগারের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বড় ধরনের দুর্নীতির তথ্য পেয়ে জেল সুপারসহ ৩৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে এই কমিটি। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের সাবেক জেলার এস এম মহিউদ্দিন হায়দারের নাম থাকায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। অথচ মহিউদ্দিন হায়দার তদন্তকালীন সময়ের ২২ মাস আগেই কুষ্টিয়া কারাগার হতে বাগেরহাট কারাগারে একই পদে (জেলার) যোগদান করেছেন এবং এখনও সেখানেই কর্মরত তিনি। ফলে তদন্ত কমিটির রিপোর্টের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে মহিউদ্দিন হায়দারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করার কারণ খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরেকটি তদন্ত কমিটি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো: শহিদুজ্জামান বলেন, এরকম একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখব।’

জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৫ জুন কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের জেলার হিসেবে নিয়োগ পান এস এস মহিউদ্দিন হায়দার। এখানে টানা ২০ মাস দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি নতুন কর্মস্থল বাগেরহাট জেলা কারাগারে জেলার হিসেবে যোগ দেন তিনি। সম্প্রতি কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সুরক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ বেলাল হোসেন এবং উপ-সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনকে দিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গঠিত কমিটি গত বছরের ১৬ ও ১৭ নভেম্বর সরেজমিন তদন্ত করে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের জেল সুপার মো: জাকের হোসেন, সাবেক জেলার এস এম মহিউদ্দিন হায়দারসহ ৩৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিবের কাছে রিপোর্ট পেশ করে।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত মোট ১৬ মাসের কুষ্টিয়া কারাগার ক্যান্টিনের আয়-ব্যয়ের হিসাব নেয়া হয়েছে। কারাগারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ি এই ১৬ মাসে ক্যান্টিন থেকে আয় হয়েছে ৩৩ লাখ ১ হাজার ৭ শত ৪৩ টাকা। এই সময়ের মধ্যে ক্যান্টিনের পেছনে কারা কর্তৃপক্ষ ব্যয় করেছে ৩৪ লাখ ৯৮ হাজার ১ শত ৬৮ টাকা। অর্থাৎ ক্যান্টিন চালাতে গিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ ১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা উদ্বৃত্ত খরচ করেছে। ক্যান্টিন পরিচালনা নীতিমালা অনুযায়ি বন্দি ও কারারক্ষি কল্যাণে খরচ দেখানো হলেও বিল ভাউচার পরীক্ষা এবং বন্দি ও কারারক্ষিদের বক্তব্য অনুযায়ি মূলত তাদের কল্যাণে কোনো টাকা খরচ করা হয়নি। জেল সুপার নিজের ইচ্ছামত ক্যান্টিনের লাভ্যাংশ খরচ করেছেন। কারারক্ষি ও বন্দিদের কাছে জেলারের দায়িত্বে নিয়োজিত ডেপুটি জেলার আমিরুল ইসলামের কোনো গুরুত্বই নেই। সবকিছু জেল সুপার নিয়ন্ত্রন করেছেন। প্রত্যেক মাসে কারা ক্যান্টিনের লাভ্যাংশের টাকা বিধি বহির্ভূতভাবে খরচ দেখিয়ে জেল সুপার ও হিসাব রক্ষক কুক্ষিগত করেছেন। এক্ষেত্রে জেল সুপার মো: জাকের হোসেন এবং হিসাব রক্ষক আজহার আলীর আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি স্পষ্ট।



তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এই ১৬ মাসে তাদের দায়িত্বকালে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের খাদ্য হিসেবে সরবরাহকৃত সবজি, মাছ, মাংস ও ডাল নিম্নমানের ছিল। বন্দিদের নির্ধারিত ডায়েটস্কেল অনুযায়ি নির্ধারিত পরিমাণ খাবার সরবরাহ না করে বরাদ্দকৃত অর্থ তারা আত্মসাত করেছেন। কারাগারে আটক বন্দিদের নিকট থেকে বন্দি বেচা-কেনা, সাক্ষাত ও জামিন বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য চিকিৎসা বাণিজ্য, পিসি বাণিজ্য, পদায়ন বাণিজ্য এবং কারাভ্যন্তরে মাদক প্রবেশ বাণিজ্যসহ এসকল অনিয়ম জানা সত্বেও নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা হিসেবে জেল সুপার মো: জাকের হোসেন সেগুলো বন্ধ করেননি। জেল সুপার অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতিদিন প্রতিমাসে বন্দিদের নিকট থেকে টাকা আদায়পূর্বক আদায়কৃত অর্থ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সাথে ভাগ-বাটোয়ারা করেছেন। কারাগারের ভিতর মধ্যযুগীয় কায়দায় বন্দীদের চোখ ও হাত-পা বেঁধে নির্যাতন চালানো হয়। বন্দীদের নির্যাতন চালানোর পেছনে ৫ জন কারারক্ষীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এরা হলেন কারারক্ষি নুরুজ্জামান, সামসুল হক, মাহফুজুর রহমান, মজিবর রহমান ও তপন কুমার হাওলাদার। এছাড়াও কারাগারের ভিতর মাদকসহ নিষিদ্ধ মালামাল প্রবেশ ও বিক্রির পেছনে জেল সুপারের নিয়ন্ত্রিত কারারক্ষি দেলোয়ার হোসেন, মুরাদ হোসেন, সহকারী প্রধান কারারক্ষি শরিফুল ইসলাম, গেট চাবি কারারক্ষি সাইদুল ইসলাম, কারারক্ষি বাদল হোসেন, ফারুক রহমানসহ আরো ৫ জন জড়িত।

রিপোর্টে যাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে :

কারারক্ষি আবু সাইদ, কারারক্ষি (অর্ডারলি) জিয়াউর রহমান, খাদ্য গুদাম সহকারী মনিরুজ্জামান, কারারক্ষি (ভর্তি শাখা) মাহাবুবর রহমান, মামুন হোসেন-১, কারারক্ষি (উৎপাদন শাখা) সোহেল রানা, কারারক্ষি (গেট অর্ডার) দেলোয়ার হোসেন, মুরাদ হোসেন, গেট চাবি কারারক্ষি সাইদুল ইসলাম, বাদল হোসেন, ফারুক আহম্মেদ, ডিউটি বন্টনকারী কারারক্ষি মজিবর রহমান, সহকারী প্রধান কারারক্ষি শরিফুল ইসলাম, কারারক্ষি আনিচুর রহমান, হারুন অর রশিদ, মাসুদ রানা, আরিফুল ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক, আশিকুর রহমান, রাশেদুল ইসলাম, মামুন হোসেন-২, জসিম উদ্দিন, আমিরুল ইসলাম, আফছার হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম রেজা, নুরুজ্জামান, সামসুল হক, মাহফুজুর রহমান, প্রধান কারারক্ষি শফিকুল ইসলাম, মজিবর রহমান, তপন কুমার হালদার, হিসাব রক্ষক আজহার আলী, প্রাক্তন জেলার এস এম মহিউদ্দিন হায়দার এবং জেল সুপার মো: জাকের হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুপারিশ করছে তদন্ত কমিটি। পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার কারণে যশোর বিভাগীয় ডিআইজি’র বিরুদ্ধে বিধিগত ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।

অথচ তদন্তকালিন সময়ে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের সাবেক জেলার এস এম মহিউদ্দিন হায়দার বাগেরহাট জেলা কারাগারে জেলারের দায়িত্বে ছিলেন।

মজার বিষয় হচ্ছে- এস এম মহিউদ্দিন হায়দারের পর কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে জেলার হিসেবে আরও চারজন দায়িত্ব পালন করেছেন, অথচ তদন্ত কমিটির রিপোর্টে তদন্তকালিন জেলার কিংবা ডেপুটি জেলার কারোরই নাম নাই।

এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা কারাগারের জেলার এস এম মহিউদ্দিন হায়দার বলেন, ২০১৬ সালের ৫ জুন থেকে ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আমি কুষ্টিয়া কারাগারে জেলার হিসাবে দায়িত্ব পালন করি। আমি দায়িত্ব হস্তান্তরের পর তদন্ত কমিটির তদন্ত চলাকালীন সময় পর্যন্ত কুষ্টিয়া কারাগারে জেলার হিসেবে আরো ৪ জন দায়িত্ব পালন করেছেন। যে সময়ে দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত করা হয়েছে- ওই সময়ের মধ্যে দায়িত্ব পালনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। অথচ আমি বুঝতে পারছি না কি কারনে আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা হলো?

মহিউদ্দিন হায়দার বলেন, ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারী কুষ্টিয়া কারাগার হতে বদলী হয়ে বাগেরহাট কারাগারে যোগদান করি। ২০১৯ সালের ২০ অক্টোবর কুষ্টিয়া কারাগারের জেল সুপার মো. জাকের হোসেন স্যারের বিভিন্ন অনিয়ম, দূনীতি বিষয়ে দৈনিক সমকাল পত্রিকায় রির্পোট প্রকাশিত হয়। এরপর ২০১৯ সালের ১৬ এবং ১৭ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুরক্ষা সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ বেলাল হোসেন স্যার এবং উপসচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন স্যার কুষ্টিয়া কারাগার পরিদর্শন করে জেল সুপার জাকের হোসেন স্যারসহ কারারক্ষিদের বিভিন্ন অনিয়ম, দূর্নীতির প্রমাণ পান। অথচ রিপোর্টে তারা আমার নাম জড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, আমার অনুপস্থিতিতে আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অথচ আমার কোনো বক্তব্যই নেয়নি তদন্ত কমিটি। দুর্নীতি তদন্তের সময়কালেতো কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে কোনো দায়িত্বেই আমি ছিলাম না।

দুর্নীতির বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের জেল সুপার মো: জাকের হোসেনের মোবাইলে (০১৭৬৯-৯৭০৬৩০) কল করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিযোগটি সম্পূর্ন বানোয়াট, ভিত্তিহীন। তদন্ত কমিটি অনুমান নির্ভর একটি রিপোর্ট দিয়ে আমাদের ব্যাক্তিগত ইমেজ ক্ষুন্ন করার অপচেষ্টা করছেন। কুষ্টিয়া কারাগার একটি মডেল কারাগার। এখানে কোন প্রকার অনিয়ম হয় না। তিনি বলেন, তদন্ত রিপোর্টে অনিয়ম, দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক জেলার এস এম মহিউদ্দিন হায়দারের নাম আছে, অথচ তদন্তকালীন জেলার এবং ডেপুটি জেলারের নাম নাই, কেন? কারাগারের বাস্তব চিত্রের সাথে রিপোর্টের কোন মিল নাই বলেও দাবী করেন তিনি।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top