ঢাকা মঙ্গলবার, ৪ঠা আগস্ট ২০২০, ২১শে শ্রাবণ ১৪২৭


হরিলুট চলছে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটে


প্রকাশিত:
২৯ জুলাই ২০২০ ১৩:২৭

আপডেট:
২৯ জুলাই ২০২০ ২২:০৫

ছবি- সময়নিউজ ডট নেট

হরিলুট চলছে দিনাজপুরস্থ বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে কর্তাব্যক্তি পর্যন্ত লুটপাটে কে কাকে পেছনে ফেলবেন; এ নিয়ে রীতিমতো অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে এখানে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) থেকে বিভিন্ন সময়ে দূর্নীতির দায়ে বদলী হয়ে আসা সাজাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গত কয়েক বছর যাবত প্রতিষ্ঠানটিতে লুটপাট চালালেও যেন দেখার কেউ নেই!

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো: আবদুল আউয়াল ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো: নুর আলম এবং ল্যাবরেটরী এটেডেন্ট ও ৪র্থ শ্রেণী কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেট লুটপাটে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কোনপ্রকার দরপত্র কিংবা কার্যাদেশ ছাড়াই নামে-বেনামে অথবা ডিপিএম’র মাধ্যমে ল্যাবরেটরির কেমিক্যাল থেকে শুরু করে যাবতীয় কেনা কাটা ও উন্নয়ন কর্মকাÐের ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে গত কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছে মামুন সিন্ডিকেট।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ২০১৮ সালে ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম (এনএটিপি) এ অনিয়মের অভিযোগে ড. মো: আবদুল আউয়ালকে শাস্তিমূলক বদলি হিসেবে পাঠানো হয় বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটে। এরপর ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর কৃষি মন্ত্রনালয়ের উপসচিব মো: আল মামুন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে আবদুল আউয়ালকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি), ঢাকায় বদলী করা হলেও দূর্নীতির অভিযোগ থাকায় আবদুল আউয়ালকে কাউন্সিলে ঢুকতে দেয়নি সেখানকার কর্মকর্তারা। পরে ১৮ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে মাত্র ৫ দিনের ব্যবধানে কৃষি মন্ত্রনালয়ের উপসচিব মোর্শেদা আক্তার স্বাক্ষরিত (বিএআরসি’র সংযুক্তি বাতিল পূর্বক) অপর এক আদেশ জারি করলে পূনরায় দিনাজপুরে যেতে বাধ্য হন আবদুল আউয়াল। পানিশমেন্ট পোস্টিং হিসেবে গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটে তার কোন প্রশাসনিক দায়িত্ব পাওয়ার কথা না থাকলেও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাকে মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার পাশাপাশি প্রশাসন, অর্থ ও হিসাব এবং পরিকল্পনা ও মূল্যায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। এদিকে আবদুল আউয়ালের সকল কাজে প্রশাসন এবং অর্থ ও হিসাবের দায়িত্বে থাকা বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো: নূর আলম সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে আবদুল আওয়াল কিংবা মামুনের সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনষ্টিটিউট এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো: নুর আলমের মোবাইল ফোনে (০১৭২৪-৯২১৯০৪) কথা হলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, “কারো সহযোগি হিসেবে নয়, বরং ডিজি স্যারের পরামর্শক্রমেই সব কাজ করেন তিনি। এসময় তিনি আরও জানান, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত আমি দেশের বাইরে ছিলাম। স্কলারশীপ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে পিএইচডি করতে উল্লেখিত সময়ে আমি চায়নাতে অবস্থান করি। এরপর দেশে ফিরেই ২০১৮ সালের ২২ জুলাই অফিসে যোগদানের পর মামুনকে দেখতে পাই। এর আগ পর্যন্ত আমি মামুনকে চিনতামও না। তবে মামুনের কিছু ঝামেলার বিষয়ে আমি শুনেছি। আব্দুল আউয়ালের পক্ষে সাফাই গেয়ে নুর আলম বলেন, আউয়াল সাহেব যাতে গ্রেড-২ কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি না পান সেজন্য একটি চক্র তাকে জামায়াত বানানোর পায়তারা করছে এবং মামুনের সংগে তাদেরকে জড়িয়ে রেপুটেশান খারাপ করার চক্রান্ত করছে। ড. মো: নুর আলম কোন দুর্নীতির সাথে জড়িত নন এবং মামুনের সাথেও তার কোনপ্রকার অনৈতিক যোগাযোগ নাই বলেও দাবি করেন তিনি।”

এ বিষয়ে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো: আবদুল আউয়ালের মোবাইলে (০১৭১৩-৫১৬২১৭) কল করা হলেও তিনি তাতে সাড়া দেন নি।

মামুনের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ?

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে ল্যাবরেটরি থেকে কেমিক্যাল চুরির অপরাধের শাস্তি হিসেবে মামুনুর রশীদকে বদলী করা হয় তার নিজ এলাকা দিনাজপুরস্থ বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনষ্টিটিউটে। শাস্তি হলেও দিনাজপুরে পোস্টিং মামুনের জন্য অনেকটাই সুখকর হয়েছে। যে কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইনষ্টিটিউটে নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন তিনি। ল্যাব এটেডেন্ট হয়েও পুরো ল্যাবরেটরীর চাবি থাকে মামুনের দখলে। মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো: আবদুল আউয়াল ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো: নুর আলমের যোগসাজসে নিয়ম করে প্রতি তিন থেকে ৬ মাস অন্তর কেমিক্যালসহ বিভিন্ন কেনাকাটার নামে বছরে প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা। নিয়ম অনুযায়ি ১০ লাখ টাকার অধিক মূল্যের কোন কিছু ক্রয়-বিক্রয়ে টেন্ডারের বিধান থাকলেও তার কোন তোয়াক্কা করছেন না মামুন সিন্ডিকেট।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নে কোন প্রকার টেন্ডার কিংবা দরপত্র ছাড়াই সাপ্লাইয়ের কাজ করার জন্য ছোট ভাইয়ের নাম ব্যবহার করে ‘বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজ’ নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান গড়েছেন মামুন। নিজেই স্বাক্ষর করে বিভিন্ন কাজের লাখ লাখ টাকা বিলও তুলে নিচ্ছেন তিনি। প্রায় ২ বছর ধরে কেমিক্যাল কেনার নামে একই কেমিক্যাল দেখিয়ে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিচ্ছেন মামুন ও তার সহযোগি আবদুল আউয়াল এবং নুর আলম। কোন প্রকার নিয়মের তোয়াক্কা না করে গেল কয়েক মাসেই পতাকা উত্তোলন ও বেদি নির্মাণ, মেইনগেটের সামনে প্রাচীর মেরামত, শহীদ মিনার, যান্ত্রিক শেড এবং সেমিনার রুমের টয়লেট নির্মাণ বাবদ প্রায় ২০ লক্ষ টাকার অতিরিক্ত বিল তুলে নেয় মামুন সিন্ডিকেট। নির্ধারিত কমিশনের বিনিময়ে বিল উত্তোলনে মামুনকে সহযোগিতা করেন নূর আলম এবং আব্দুল আউয়াল।

অভিযোগে জানা গেছে, দিনাজপুরের কাহারুল উপজেলার ৫ নং সুন্দর ইউনিয়নের শিবিরের সেক্রেটারি থাকা অবস্থায় ২০০৪ সালে তৎকালিন সংসদ সদস্য জামায়াত নেতা আব্দুল কাফির সুপারিশে চাকুরি পান মামুন। এখনো জামাত ও শিবিরকে নিয়মিত ডোনেশন দিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জামাত-শিবিরের নেতৃবৃন্দ। দিনাজপুর উত্তর জামাতের ইয়ানত (চাঁদা) রশিদ সূত্রে জানা গেছে, মামুন গত বছর বাৎসরিক এককালীন ডোনেশন দিয়েছেন ১ লাখ টাকা এবং প্রতিমাসে ইয়ানত বাবদ তার বেতনের (সর্বসাকূল্যে ২১ হাজার ৫৫৮ টাকা) ৫ শতাংশ হিসেবে ১ হাজার টাকা মাসিক চাঁদা দিয়ে আসছেন তিনি। এছাড়াও গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি- জামাত জোটের পক্ষে পিকেটিং এবং গাড়ি ভাংচুরের অভিযোগে যৌথবাহিনীর অভিযানের কারনে বাসায় না থেকে মামুন ইনস্টিটিউটের গেষ্টরুম (২০৮ নম্বর কক্ষ) দখল করে আছেন অদ্যাবধি।

সূত্র মতে, ৪র্থ শ্রেণির সামান্য বেতনের একজন কর্মচারী মামুনের বাবা স্থানীয় বাজারে জিলাপীর দোকানদার। অথচ ব্যাক্তিগত গাড়িসহ (ঢাকা মেট্রো-গ, ১৩-৬৯১১, ঢাকায় ভাড়া দিয়ে রেখেছেন) একাধিক মোটেরসাইকেলে চড়েন মামুন। গাজীপুরের পশ্চিম সামন্তপুর মৌজায় ৩ কাটা জায়গায় বাড়ি করছেন, যার বাউন্ডারির কাজ শেষ। দিনাজপুরে তার নিজ গ্রামে ৫ তলা ফাউন্ডেশনে তৈরিকৃত বাড়ির ইতোমধ্যেই ২ তলার কাজ সম্পন্ন হয়ছে। মামুন প্রায় প্রতি মাসেই একাধিকবার ঢাকায় যাতায়াত করেন বিমানে!

এ বিষয়ে মামুনুর রশীদের মোবাইল ফোনে (০১৯১২-৩৪৩২৬৪) কল করে জানতে চাইলে তিনি সময়নিউজকে বলেন, “একেবারেই ঢাহা মিথ্যা কথা। এসব আমার ভাইয়ের সম্পদ, কিছু কারণে আমার নামে করা হয়েছে। আরও বিস্তারিত জানতে হলে মোবাইলে কথা না বলে দিনাজপুর গিয়ে সরাসরি কথা বলার অনুরোধ করে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করেন তিনি। কিছুক্ষণ পর ফিরতি কলে মামুন জানান, ঈদের পর তিনি ঢাকায় আসবেন। এইসময় পর্যন্ত নিউজটা যাতে না করা হয় সেজন্য অনুরোধ করেন তিনি। এসময় জামায়াত-শিবিরকে পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি সত্য নয় দাবী করে মামুন বলেন, কেউ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অপচেষ্টা করছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সময় জামাত-শিবির সংগঠনকে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন বলে স্বীকার করেন তিনি।”

এসব বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনষ্টিটিউট এর মহাপরিচালক ড. মো: এছরাইল হোসেন এর মোবাইলে (০১৭১৩-৩৬৩৬৩০) ২৫ জুলাই শনিবার দুপুর ৩.২৮ মিনিটে কল দিলে তিনি এ সময়নিউজকে বলেন, “এগুলা নিয়ে ওভার টেলিফোনে কথা বলা যাবে না। তথ্য জানতে হলে আপনাকে দিনাজপুরে আসতে হবে।” মোবাইলে বললে কি সমস্যা? প্রশ্ন করা হলে কোন উত্তর না দিয়েই সাথে সাথে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনষ্টিটিউট এর বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় এর আগে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও বহাল তবিয়তেই আছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top