ঢাকা বুধবার, ২৮শে জুলাই ২০২১, ১৩ই শ্রাবণ ১৪২৮


টাকা দিলেই সনদ মিলে!


প্রকাশিত:
১০ আগস্ট ২০২০ ২১:৩০

আপডেট:
১০ আগস্ট ২০২০ ২২:২৬

কোনপ্রকার পড়াশোনা কিংবা পরীক্ষা ছাড়াই উচ্চ শিক্ষার সনদ পাওয়া যাবে! ডিগ্রী ভেদে এসব সনদ নিতে খরচ পড়বে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা। খোদ রাজধানীতেই ভূয়া সনদ বিক্রির এমন একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সন্ধান মিলেছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু ভূয়া সনদের কপিও পাওয়া গেছে।

‘দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা’ নামে রাজধানীর উত্তরা ৮নং সেক্টরের ৯/বি পলওয়েল করনেশন টাওয়ারের ওপরে জায়গা ভাড়া নিয়ে একটি অসাধু চক্র দীর্ঘদিন ধরে মূলত ভূয়া সনদ বাণিজ্যের কারখানা খুলে বসেছে। খোদ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ শায়খ মোহাম্মদ বায়েজীদ-উল-হাসান ও তার কয়েকজন অনুসারি (ফিরোজ, এনামুল, বাবু, মেহেদী, তানভীর) মিলে ভূয়া সনদ বিক্রির বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। চক্রটি ব্যাচেলর ও মাষ্টার্স ডিগ্রী, বিবিএ-এমবিএ, ইএমবিএসহ প্রায় অর্ধশতাধিক শর্ট কোর্সেরও সনদ বিক্রি করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আর টাকার বিনিময়ে ভূয়া সনদ কিনে পদে পদে প্রতারিত হচ্ছে অসাধু শিক্ষার্থীরা।

অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন সূত্রে জানা গেছে, দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার কোন অনুমোদনই নেই। তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে ইতোমধ্যে পত্রিকায় বেশ কয়েকটি গণবিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছে কমিশন।

অভিযোগ রয়েছে, চক্রটি নিকট অতীতে দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটির নামে সনদ বিক্রি করতো। মূলত টাকার বিনিময়ে সনদ বিক্রি করাই হচ্ছে চক্রটির কাজ। তারা কয়েকটি ধাপে এসব ভূয়া সনদ হস্তান্তর করে। প্রথমে ভর্তি রেজিস্টারসহ সব জায়গায় সনদ প্রার্থীর নাম থাকে। কিছুদিন পর সেসব সনদের তথ্য ইউনিভার্সিটির মূল সার্ভার থেকে মুছে ফেলা হয়। ফলে বিভিন্ন দপ্তর, পরিদপ্তরে চাকরীর জন্য আবেদন করলে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে ভূয়া সনদধারীরা।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ শায়খ মোহাম্মদ বায়েজীদ-উল-হাসান এ পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার ভূয়া সনদ বিক্রি করে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। প্রতি সনদে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এই করোনা সংকটেও তিনি প্রায় শতাধিক সনদ বিক্রি করেছেন। প্রায় ২৫টির মতো ব্যাংক একাউন্ট রয়েছে বায়েজীদের। তার বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ নানান অভিযোগে দেশের বিভিন্ন থানায় ৫টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। অনিয়মের দায়ে তিনি বিমান বাহিনী হতে চাকরিচ্যুতও হয়েছেন। বাড়ী নং ৩৭, রোড নং ০৮, সেক্টর ১২, উত্তরার ঠিকানা হচ্ছে দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার সনদ বিক্রির কারখানা। টাকা দিলেই মূহুর্তের মধ্যেই www.unicedu.ac.bd ওয়েবসাইটে আপলোড হয়ে যায় শিক্ষার্থীর নাম ঠিকানা। আর এই ওয়েবসাইট দেখভাল করেন বায়েজীদ-উল-হাসান নিজেই।

সনদ বাণিজ্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার ট্রেজারার তানভীর আহমেদ বলেন, ‘সনদ বাণিজ্যের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। ইউনিভার্সিটির সবকিছু দেখভাল করেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এবং তিনিই অল ইন অল। কোনো অনিয়ম হলে চেয়ারম্যানের হাত দিয়ে ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। দুর্নীতি করলে তিনি এবং তার কিছু লোকজন করতে পারেন। এ বিষয়ে আমিসহ আমাদের ট্রাস্টিবোর্ডের অন্য সদস্যরাও উদ্বিগ্ন। কয়েকদিন পর পর সার্ভার থেকে ছাত্রদের আইডি মুছে যাচ্ছে, কিন্তু কীভাবে এটা হচ্ছে- বা কে করছে তা নিয়ে আমাদের ট্রাস্টিবোর্ডে একাধিকবার আলোচনাও হয়েছে বলে জানান তিনি।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ শায়খ মোহাম্মদ বায়েজীদ-উল-হাসান সাবেক এমপি প্রয়াত জামায়াত নেতা মুফতি আব্দুস সাত্তারের নাতনী জামাই। তিনি নামে-বেনামে প্রায় ১৫টির অধিক মোবাইল সিমকার্ড ব্যবহার করেন। তবে কখনই তাকে ফোনে পাওয়া যায় না। কারন হিসেবে তার এক সহকর্মী জানান, বায়েজিদ-উল-হাসান নিজের প্রয়োজনেই সিমগুলো ব্যবহার করেন এবং কথা শেষ হলে সাথে সাথেই উক্ত নম্বরগুলো বন্ধ করে দেন। ইতোমধ্যে ১৩ টি সিমের নম্বর (০১৯০৬-১৪৭৪১৫, ০১৫৩১-৫৩২৫৪০,০১৭৪৭-২১১৩৪০, ০১৭২৮-২৭৯৪৬৪, ০১৮৫৩-৬৯৯৩৮৭, ০১৭৫৭-৩১৪৪৭৭, ০১৯১৭-৭২৩৫৫৪, ০১৭২৩-৯০২৬০৩, ০১৯৮৬-৩৩৮০৭৮, ০১৫৫৮-১৫৪৫৬৫, ০১৭৫২-২০১৭৬৩, ০১৬২৩-২৮০১৭, ০১৯২০-৬৪৯৯৮২) পাওয়া গেছে।

শুধু তা-ই নয়, বায়েজিদ-উল-হাসানের জাতীয় পরিচয়পত্রও ২টি। প্রথমটিতে তার নাম আঃ, স, ম, বায়েজীদ-উল-হাসান, পিতা আ, ক, ম শফিকুল ইসলাম, মাতা- দিলওয়ারা বেগম, জন্ম তারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৭৮ইং, গ্রামের বাড়ী মোড়লগঞ্জ, বাগেরহাট। আর দ্বিতীয়টিতে তার নাম ড. এ, এস, এম বায়েজীদ-উল-হাসান, পিতা-এ কে এম শফিকুল ইসলাম, মাতার নাম দিলারা বেগম। এই আইডিতে জন্ম তারিখ কমিয়ে করা হয়েছে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮১ইং। যা আগেরটির চেয়ে ৩ বছরের কম। এখানে ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে উত্তরা, ঢাকার।

সনদ বাণিজ্য প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার ট্রাস্টিবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ শায়খ মোহাম্মদ বায়েজীদ-উল-হাসানের উল্লেখিত নাম্বারগুলোতে একাধিকবার কল দিলেও সবগুলো নাম্বার বন্ধ পাওয়া গেছে। পরবর্তিতে উত্তরা অফিসে গিয়েও তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top