ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ই আশ্বিন ১৪২৭


*নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় *দুদকের নোটিশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি *স্বপদে বহাল থাকতে লবিং তদবির

গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সীমাহীন অভিযোগ


প্রকাশিত:
২৭ আগস্ট ২০২০ ০৯:১৩

আপডেট:
২৮ আগস্ট ২০২০ ১৬:২৮

ছবি- সংগৃহীত

রংপুর গণপূর্ত জোনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নানা অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগে মো. আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে গত বছরের আগস্টে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধান চলাকালিন সময়েই চার মাস পর ৩১ ডিসেম্বর গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পান আশরাফুল। দুদকের অনুসন্ধানে আশরাফুল আলম ও তার স্ত্রী সাবিনা আলমের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়ায় গত ৯ জানুয়ারি তাদের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দেয় সংস্থাটি। দুদকের পরিচালক কাজী শফিকুল আলম স্বাক্ষরিত আলাদা আলাদা নোটিশ আশরাফুল আলম ও সাবিনা আলমের গুলশানের বাসার ঠিকানায় পাঠানো হয়। আশরাফুল আলম ও তার স্ত্রী সাবিনা আলমের অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক মেফতাহুল জান্নাত।

দুদকের ৯ জানুয়ারির ওই নোটিশে পরবর্তি ২১ কার্যদিবসের মধ্যে আশরাফুল আলম ও তার স্ত্রী সাবিনা আলমসহ তাদের নির্ভরশীল ব্যক্তিদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, দায়দেনা, আয়ের উৎস ও তা অর্জনের বিস্তারিত বিবরণ নির্ধারিত ফরমে দাখিল করতে বলা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরনী দাখিল করতে ব্যর্থ হলে অথবা মিথ্যা বিবরনী দাখিল করলে ২০০৪ (২০০৪ সনের ৫ নং আইন) আইনের ধারা ২৬ এর উপ-ধারা (২) মোতাবেক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়। অথচ ৮ মাসেরও অধিক সময় অতিবাহিত হলেও দুদকের নোটিশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আশরাফুল আলম একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতি করেই চলেছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে গড়া কোটি টাকার বিনিময়ে পুনরায় প্রধান প্রকৌশলীর পদ টিকিয়ে রাখতে শুরু করেছেন লবিং-তদবির।

এ বিষয়ে গত ২৬ জুলাই রোববার দুদক চেয়ারম্যান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী এবং গণপূর্ত সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন গণপূর্ত বিভাগের জনৈক ঠিকাদার মো. তৌফিক ইসলাম। অভিযোগে তৌফিক ইসলাম জানান, গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পর থেকেই আরও বেপরোয়াভাবে আশরাফুল আলম উর্ধ্বতন মহলকে ম্যানেজ করে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ কাজ অব্যাহতভাবে করে চলেছেন। তার নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ কাজের ফলে গণপূর্ত অধিদফতর কলঙ্কিত হচ্ছে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া প্রধান প্রকৌশলী পদে বহাল রেখে আশরাফুল আলম এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্ত করলে তা কখনোই সুষ্ঠু হবে না। আশরাফুল আলম যুবলীগের কথিত নেতা ও বিতর্কিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম (জি কে শামীম) সিন্ডিকেটের সদস্য বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেছেন তৌফিক ইসলাম।

জানা গেছে, বিসিএস ১৫তম ব্যাচের প্রকৌশলী আশরাফুল আলম ১৯৯৫ সালে গণপূর্ত অধিদফতরে সহকারী প্রকৌশলী পদে যোগ দেন। ১৯৯৮ সালে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, ২০০৭ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী, ২০১৬ সালে তত্তাবধায়ক প্রকৌশলী, ২০১৮ সালে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি। শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১, মেডিক্যাল কলেজ ডিভিশন, গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেল এবং রংপুর গণপূর্ত জোনে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এসব জায়গায় দায়িত্ব পালনের সময় দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। গতবছর শুদ্ধি অভিযানে গ্রেপ্তার হন ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম (জি কে শামীম)। তার সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুদক। এদের মধ্যে আশরাফুল আলমসহ সাবেক তিন প্রধান প্রকৌশলীর পাশাপাশি বেশ কয়েকজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নামও তালিকায় রয়েছে।

দুদকে তৌফিক ইসলামের করা অভিযোগ থেকে জানা গেছে, আশরাফুল আলমকে প্রধান প্রকৌশলী হতে সাহায্য করেন জি কে শামীমের ঘনিষ্টজন রিন্টু আনোয়ার নামের এক ঠিকাদার। রিন্টু আনোয়ার এবং সদরুল ইসলাম সায়মন নামে অপর এক ঠিকাদারের সাথে আশরাফুলের ঠিকাদারি ব্যবসা আছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১০ নভেম্বর রিন্টু আনোয়ার ও সদরুল ইসলাম সায়মনের মধ্যে একটি চুক্তিনামা হয়। চুক্তিনামায় উল্লেখ- ‘অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলমকে পদোন্নতি দিয়ে প্রধান প্রকৌশলী হতে সহায়তা করা হবে। এ কাজে ২০ কোটি টাকা খরচ হবে যার পুরোটাই সদরুল ইসলাম সায়মন বহন করবেন। প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পরবর্তী ৭ দিনের মধ্যে আশরাফুল আলম ২০ কোটি টাকা রিন্টু আনোয়ারকে দিতে বাধ্য থাকবেন। সেক্ষেত্রে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য রিন্টু আনোয়ারকে সদরুল ইসলাম তার নিজ একাউন্টের ২০ কোটি টাকার একটি চেক (নং- ১০৩৮৯৬, রূপালী ব্যাংক লিমিটেড, রাজশাহী) প্রদান করেছেন। কিন্তু চুক্তির পর কয়েক মাসের মধ্যেও উল্লেখিত টাকা পরিশোধ না করায় গত ২১ জুলাই রিন্টু আনোয়ার সদলবলে প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের কক্ষে প্রবেশ করেন। এসময় কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

ওই অভিযোগে আরও জানা গেছে, রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেলে ওয়াহিদুল ইকবালসহ নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার রয়েছেন যাদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব ব্যবসা করেন আশরাফুল আলম। সার্কেলে থাকার সময় আশরাফুল সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীদের কাছ থেকে প্রতিমাসে আপ্যায়ন বাবদ ৮০ হাজার টাকা করে আদায় করতেন। এছাড়া প্রতিটি প্রকল্পে ১৫ শতাংশ কমিশন নিতেন তিনি। তত্তাবধায়ক প্রকোশলী থেকে পদোন্নতি পাওয়ার কিছুদিন আগে দরপত্র আহবানের মাধ্যমে বিভিন্ন ঠিকাদারকে প্রায় ১শ কোটি টাকার কাজ দিয়ে কমিশন তুলে নেন তিনি। ফান্ডে অর্থ না থাকায় সেই ঠিকাদাররা এখন পড়েছেন চরম বিপাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ উপার্জনের টাকায় আশরাফুল আলম তার নিজ জেলা বগুড়ায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। স্ত্রী-সন্তানদের নামেও সেখানে সুবিশাল বাড়ি ও সম্পত্তি রয়েছে। এছাড়া শ্বশুর-শাশুড়ি ও নিকট আত্মীয়দের নামে রয়েছে কৃষিজমি ও ব্যবসা। ঢাকায় প্রায় দেড় কোটি টাকা দিয়ে স্ত্রীর নামে কিনেছেন আলিশান ফ্ল্যাট। গুলশানে আরো দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। স্ত্রীর নামে ব্যাংকে আছে বড় অংকের এফডিআর, মাসিক সঞ্চয় ও একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সন্তানদের নামেও রয়েছে কোটি টাকার সম্পদ। পরিবারের সদস্যদের দিয়ে বিভিন্ন আর্থিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা করছেন তিনি। মালয়েশিয়ায় হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমানের অর্থ পাচার করে সেকেন্ড হোম করেছেন সরকারি এই প্রকৌশলী। এসবের পাশাপাশি আশরাফুল আলমের নামে বেনামে রয়েছে আরো প্রায় ১শ কোটি টাকার সম্পদ। প্রকৌশলী নেতাদের সখ্যতার প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতিবাজ আশরাফুল আলম কর্মস্থলে বিভিন্ন অনৈতিক ও আর্থিক কর্মকান্ডে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা আদায় করেন। এছাড়াও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নির্মাণে আশরাফুল আলমের দুর্নীতি :

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের দুর্নীতি ও অনিয়মের সত্যতা খুঁজে পায় একনেকের তদন্ত কমিটি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) একটি প্রতিনিধি দল ২০১২ সালের ১২ জুন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের নির্মাণকাজ পরিদর্শন করেন। ১০ তলা হাসপাতালের মূল ভবন, চিকিৎসকদের ৬ তলা আবাসিক ভবন, স্টাফদের আবাসিক ভবন ও নার্সদের ডরমেটরি নির্মাণকাজে ত্রুটিসহ তদন্তে মোট ১৩ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে আসে। পরে এ নিয়ে একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় একনেকে। প্রতিবেদনে প্রকৌশলী আশরাফুলসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর ওই প্রতিবেদন গণপূর্তের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর কাছে পাঠানো হলেও সুপারিশ আজও বাস্তবায়ন করা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শাহ ইসলাম কনস্ট্রাকশনকে ঘুষের বিনিময়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নির্মাণের কাজ পাইয়ে দেন আশরাফুল। ২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি চূড়ান্ত করে। ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট মেসার্স শাহ ইসলাম কনস্ট্রাকশনকে কাজ করার অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৩৩ কোটি টাকার প্রকল্প এটি। প্রকল্প বাস্তবায়নে শাহ ইসলাম কনস্ট্রাকশনের অধীনে আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে সহযোগী নির্মাতা হিসেবে চুক্তিপত্রে দেখানো হয়। কায়কোবাদের লাইসেন্স ব্যবহার করে যৌথভাবে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নির্মাণ করা করা হয়। ওই চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মেসার্স রফিক ট্রেডার্সকে চিকিৎসকদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ, মেসার্স জ্যাকো কনস্ট্রাকশন ও মেসার্স ইন্সটেন্সকে স্টাফদের আবাসিক ভবন নির্মাণ ও মেসার্স খলিলুর রহমানকে নার্সদের ডরমেটরি নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়। অভিযোগ আছে, কায়কোবাদসহ অন্যান্য ঠিকাদারের সঙ্গে আঁতাত করে উচ্চ দর দেখিয়ে মানহীন সরঞ্জাম সরবরাহ ও ব্যবহার করে হাসপাতালটি নির্মাণ করে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন আশরাফুল আলম।

শুধু তা-ই নয়, রাষ্ট্রীয় পদ-পদবি ব্যবহার করে কৌশলে ব্যক্তিগত ব্যবসার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে মানহীন সরঞ্জাম সরবরাহ করে থাকেন আশরাফুল আলম। গণপূর্তের শেরে বাংলা নগর ডিভিশন-১ এ নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে (২০০৮ সালের ১২ ফেব্রয়ারি থেকে ২০০৯ এর ৬ আগস্ট পর্যন্ত) জনপ্রতি ৩ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে ৩শ জন ভাউচারভিত্তিক কর্মচারি নিয়োগ দেন। পরে ঘটনাটি জানাজানি হলে, মোটা উৎকোচের বিনিময়ে ধামাচাপা দেন আশরাফুল। এছাড়া ভুয়া বিল, ভাউচারে বিভিন্ন ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহারের মাধ্যমে কাজ না করেই টাকা উত্তোলনপূর্বক আত্মসাৎ করেন তিনি।

এসব বিষয়ে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলমের সাথে বেশ কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে (০১৭১১-৯০২৮৭৮) একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তাতে সাড়া দেন নি।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top