ঢাকা শনিবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ই আশ্বিন ১৪২৭

সেনাবাহিনী কি পারবে মেজর (অব) সিনহার খুনের বিচার নিশ্চিত করতে?


প্রকাশিত:
৩ আগস্ট ২০২০ ১০:৫০

আপডেট:
৩ আগস্ট ২০২০ ১১:১৬

নিহত সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। ছবি- লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া।

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর নিহত হয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাত সাড়ে ১০টার দিকে সড়কের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সেনা কর্মকর্তার নাম সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান (৩৬)।

পুলিশের গুলিতে সেনা কর্মকর্তা নিহতের ঘটনায় সাংবাদিক আজাহার আলী সরকার তাঁর ফেসবুক পেইজে একটি পোস্ট দিয়েছেন।

সময়নিউজ ডট নেট পাঠকদের জন্য তা হুবহু তুলে ধরা হলো-

পুলিশের দারোগা লিয়াকত কোনরূপ কথাবার্তা না বলেই গাড়ি থেকে নামার পরপরই মেজর (অব:) সিনহাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সূত্রটি আরও জানায় যে, মেজর সিনহা গাড়ি থামিয়ে তাদের পরিচয় দিলে প্রথমে তাদের যাওয়ার জন্য সংকেত দিলেও পুলিশের এসআই লিয়াকত তাদের পুনরায় থামায় এবং তাদের দিকে পিস্তল লক্ষ্য করে গাড়ি থেকে নামতে বলে। তখন মেজর সিনহা হাত উঁচু করে গাড়ি থেকে নামার পরপরই এসআই লিয়াকত তাকে লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি করে।

সাবেক মেজর সিনহা রাশেদ খান ২০১৮ সালে স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যান। তিনি অর্থমন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন উপসচিব, মুক্তিযোদ্ধা এরশাদ খানের ছেলে। গত ৩১ জুলাই স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের তিন ছাত্র-ছাত্রীসহ জাস্ট নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলের জন্য "ভ্রমণ ভিডিও" তৈরি করতে কক্সবাজার যান তিনি। ফেরার পথে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে পুলিশের গুলিতে খুন হন তিনি। এসব আমরা এরই মধ্যে জানি।

আরও জানি যে, মেজর রাশেদ এসএসএফ-এ ছিলেন। খুব ভাল ও সৎ অফিসার হিসেবে তার নাম আছে। খেয়াল করেন, তিনি এসএসএফ এ ছিলেন।

আমরা এ কথাও জানি যে, মেধা-সততা-দক্ষতা ছাড়াও ৮/১০ টি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং ব্যাপক তদন্তে সবকিছু পজেটিভ হবার শেষে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের সন্তুষ্টির পরেই একজন সেনা অফিসারকে এসএসএফ-এ বদলী করা হয়। এইরকম একটা মানুষ খুন হলেন, কিন্তু এর ফলে সরকারের, বিশেষ করে পুলিশের যে প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে তা অপ্রতুল বলে উদ্বগেরও কারণ।

এদিকে সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিহত হওয়ার ঘটনায় আরও একটি তদন্ত কমিটি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শনিবার জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব শাহে এলিদ মইনুল আমিন স্বাক্ষরিত এক আদেশে এই কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়।

চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের এই তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। কমিটিতে জিওসি, ১০ পদাতিক ডিভিশন ও কক্সবাজারের এরিয়া কমান্ডারের একজন প্রতিনিধি, একজন উপ-পুলিশ পরিদর্শক ও একজন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন।

আদেশ পত্রে বলা হয়, সরেজমিন তদন্ত করে ঘটনার উৎস, কারণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় ইত্যাদি উল্লেখ করে সুস্পষ্ট মতামতসহ আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে এই কমিটিকে।

এরআগে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহা. শাজাহান আলীকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন এবং সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও কক্সবাজারের এরিয়া কমান্ডারের একজন প্রতিনিধি।

মেজর পর্যায়ের কর্মকর্তার ঘটনা তদন্তে মেজরের চেয়ে সিনিয়র কর্মকর্তার নেতৃত্বে কমিটি হওয়াটাই সঙ্গত ছিল, অথচ সরকার কমিটি করেছে জুনিয়র কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে!
এর মানে কি এই, সরকার খুবই কনিষ্ঠ কমিটির মাধ্যমে বিষয়টিকে গুরুত্বহীন করতে চায়? এখন পর্যন্ত কয়েকটা পুলিশ ক্লোজ করা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না! ক্লোজ করা কোনো শাস্তি না- এও তো আমরা জানি।

এই হত্যাকাণ্ডটি যেরকম চ্যঞ্চল্যকর, তাতে হাইকোর্টের একজন জজ বা জেলা জজ বা বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা সঙ্গত হতো। সেক্ষেত্রে তদন্তের আওতা বাড়তো, এবং বিস্তারিত বিষয়গুলো উঠে আসত। কিন্তু তা না করে সর্বকনিষ্ঠ পর্যায়ের কমিটি করায় বিষয়টকে ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্য সরকারের আছে কি না সে প্রশ্নও তোলা যায়।

অন্যদিকে, মেজর সিনহা একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। তার হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিয়ে সেনাবাহিনীর সদর দফতর এজি’স ব্রাঞ্চের চিঠি ইস্যু করা অভূতপূর্ব! অতীতে কখনও এমন ঘটনা ঘটেছে বলে জানা নেই। কেননা, রিটায়ার্ড হিসাবে মেজর সিনহার কোরোর লোক, কাজেই চিঠি বের করলে কোরো থেকে হওয়ার কথা। এডজুটেন্ট জেনারেল কাজ করে সার্ভিং অফিসার নিয়ে। তার মানে, আর্মি বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ‘আউট অব দ্য ওয়ে’ রিঅ্যাক্ট করেছে। এর কারণ হতে পারে, মেজর সিনহার হত্যাকাণ্ডের ইস্যুতে সেনাবাহিনী, অবসরপ্রাপ্ত অফিসার, সতীর্থ, সহকর্মী, ও সর্বোপরি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও উৎকণ্ঠাকে আমলে নেওয়া।

তাহলে দাঁড়ালো এই যে, বিষয়টি নিয়ে সেনাবাহিনী এবং সরকারের গুরুত্ব প্রদানের ধরণ বিপরীতধর্মী। এতে তাদের ভেতরকার মতভেদ পরিষ্কার দৃশ্যমান! এ অবস্থায়, সেনাবাহিনী কি পারবে তাদের অফিসার হত্যার সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে?

লেখক : নাঈমুল ইসলাম খান সম্পাদিত দৈনিক আমাদের সময় পএিকার সাবেক ডেপুটি এডিটর ও দেশের একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের মিডিয়া পরামর্শক।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top