রবিবার, ৩রা মে ২০২৬, ২০শে বৈশাখ ১৪৩৩
প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশে এখন স্বাস্থ্য সচেতনতা অনেক বেড়েছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট থেকে রাজশাহী — সব জায়গাতেই মানুষ এখন ভিটামিন, মিনারেল আর বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট কিনছেন। কিন্তু সমস্যা হলো — অনেকেই জানেন না কোন সাপ্লিমেন্ট কখন খেতে হয়।
ভুল সময়ে খেলে শরীর তা ঠিকমতো শোষণ করতে পারে না, আর কষ্টের টাকাটা পানিতে যায়। সঠিক সময়ে সঠিক সাপ্লিমেন্ট নেওয়াটা শুধু অভ্যাসের বিষয় নয়, এটা বিজ্ঞানের বিষয়।
ম্যাগনেসিয়াম
বাংলাদেশে যারা বেশি চা-কফি খান বা দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাদের মধ্যে ম্যাগনেসিয়ামের অভাব খুবই সাধারণ। পেশির টান, ঘুম না হওয়া, অকারণ মাথাব্যথা — এগুলো অনেক সময় ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে।
ম্যাগনেসিয়াম স্নায়ু শান্ত করে এবং গভীর ঘুমে সাহায্য করে, তাই এটি রাতে ঘুমানোর ৩০ মিনিট আগে নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর। প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে কাঁচা কলা, মসুর ডাল, কাজুবাদাম আর কালো তিল প্রতিদিনের খাবারে রাখলে অনেকটাই ঘাটতি পূরণ হয়।
ভিটামিন বি১২
যারা নিরামিষভোজী বা যারা খুব কম মাংস ও মাছ খান, তাদের মধ্যে বি১২-এর ঘাটতি বেশি দেখা যায়। ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, হাত-পা ঝিনঝিন করা — এগুলো বি১২ কমে যাওয়ার পরিচিত সংকেত। এই ভিটামিন শরীরে শক্তি তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে, তাই সকালে নাশতার সময় বা একটু আগে নেওয়া সবচেয়ে ভালো। দিনের শুরুতে নিলে শরীর সারাদিন এর সুবিধা পায়।
ডিম, দুধ, মাছ এবং মুরগির কলিজায় বি১২ ভালো পরিমাণে থাকে। যারা এগুলো নিয়মিত খান না, তাদের জন্য সাপ্লিমেন্ট বিশেষভাবে জরুরি।
জিংক
শিশু এবং গর্ভবতী মায়েদের মধ্যে জিংকের অভাব বাংলাদেশে অনেক বেশি। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, চুল পড়া, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া — এগুলো জিংকের ঘাটতির লক্ষণ।
জিংক খাওয়ার ১ ঘণ্টা আগে বা ২ ঘণ্টা পরে নিলে শোষণ সবচেয়ে ভালো হয়। একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — ক্যালসিয়াম বা আয়রনের সাথে একসাথে খাওয়া যাবে না, কারণ এরা পরস্পরের শোষণে বাধা দেয়। কুমড়ার বিচি, সরিষা আর মসুর ডাল জিংকের ভালো প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে প্রতিদিনের খাবারে রাখা যেতে পারে।
ভিটামিন ডি
রোদেলা বাংলাদেশে থেকেও অনেকের ভিটামিন ডি-র ঘাটতি আছে — এটা অবাক করলেও সত্যি। যারা সারাদিন অফিসে বা ঘরে থাকেন, বাইরে কম বের হন, তাদের রোদ থেকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরি হয় না। ভিটামিন ডি হাড় মজবুত রাখে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক স্বাস্থ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এটি একটি Fat-Soluble ভিটামিন, অর্থাৎ চর্বি ছাড়া ঠিকমতো শোষণ হয় না। তাই দুপুরের বা রাতের খাবারের পর — যখন খাবারে তেল থাকে — তখন নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর। প্রাকৃতিকভাবে ইলিশ মাছ, ডিমের কুসুম থেকেও ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। সকাল ১০টার আগে বা বিকেল ৩টার পরে ১৫-২০ মিনিট রোদে থাকলেও শরীর নিজেই তা তৈরি করতে পারে।
আয়রন
বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে আয়রনের ঘাটতি বা রক্তশূন্যতা একটি বড় সমস্যা। বিশেষত গ্রামের মহিলারা এবং কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। ক্লান্তি, ফ্যাকাশে চেহারা, মাথা ঘোরা — এগুলো রক্তশূন্যতার পরিচিত লক্ষণ।
আয়রন খাওয়ার ১ ঘণ্টা আগে বা ২ ঘণ্টা পরে নেওয়া উচিত। সবচেয়ে বড় ভুল যেটা অনেকেই করেন — চা বা দুধের সাথে আয়রন খাওয়া। এতে শোষণ ৬০-৭০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বরং আয়রনের সাথে লেবুর রস বা আমলকি খেলে শোষণ প্রায় দ্বিগুণ হয়, কারণ ভিটামিন সি আয়রনের সেরা সহায়ক। গরু বা মুরগির কলিজা, শিম, ডাল, পালং শাক — এগুলো আয়রনের চমৎকার প্রাকৃতিক উৎস।
কোলাজেন ও ভিটামিন সি
কোলাজেন এখন বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হচ্ছে, বিশেষত শহরের তরুণীদের মধ্যে। ত্বক টানটান রাখতে, চুল মজবুত করতে এবং হাঁটুর জয়েন্টের স্বাস্থ্যের জন্য এটি বেশ কার্যকর। তবে শুধু কোলাজেন খেলেই হবে না — ভিটামিন সি ছাড়া শরীর কোলাজেন ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না। তাই এই দুটো একসাথে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সকালে বা রাতে যেকোনো সময় নেওয়া যায়। হাড়ের ঝোল বা মুরগির পা রান্না করে নিয়মিত খেলে প্রাকৃতিকভাবেও কোলাজেন পাওয়া যায়।
ওমেগা-৩
ওমেগা-৩ হৃদরোগ প্রতিরোধে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতায় এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। বাংলাদেশে হৃদরোগ ক্রমশ বাড়ছে, তাই এই সাপ্লিমেন্টের গুরুত্বও বাড়ছে।
রাতের খাবারের পরে ওমেগা-৩ নেওয়া সবচেয়ে ভালো, কারণ এটিও চর্বিতে দ্রবণীয়। খালি পেটে খেলে অনেকের বমি বমি ভাব হতে পারে। ইলিশ, রুই, কাতলা, সামুদ্রিক মাছ — এগুলো ওমেগা-৩-এর অসাধারণ উৎস এবং বাংলাদেশে সহজলভ্যও বটে।
ক্যালসিয়াম
হাড় ক্ষয় বা অস্টিওপোরোসিস বাংলাদেশে বয়স্ক নারীদের মধ্যে একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। ক্যালসিয়াম শুধু হাড়ের জন্যই নয়, হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক রাখতেও দরকার।
ক্যালসিয়াম রাতে নেওয়া ভালো, এবং ভিটামিন ডি ও ভিটামিন কে২-এর সাথে একসাথে নিলে শোষণ অনেক বেশি হয়। দুধ, দই, ছোট মাছ (কাঁটাসহ), সজনে পাতা — এগুলো বাংলাদেশে সহজে পাওয়া যায় এবং ক্যালসিয়ামের চমৎকার উৎস।
ভিটামিন সি
ভিটামিন সি পানিতে দ্রবণীয়, তাই এটি যেকোনো সময় খাওয়া যায়। শরীর অতিরিক্তটুকু এমনিতেই বের করে দেয়। তবে আয়রনের সাথে নিলে দ্বিগুণ কাজ করে — এটা আগেই বলা হয়েছে। বাংলাদেশে আমলকি, পেয়ারা, লেবু, কাঁচামরিচ — এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি আছে এবং এগুলো প্রতিদিনের রান্নায়ও ব্যবহার হয়।
গাট হেলথ বা প্রোবায়োটিক
পেটের সুস্বাস্থ্য মানে শুধু হজম ভালো রাখা নয় — অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া সরাসরি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের সাথেও সম্পর্কিত। বাংলাদেশে পেটের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক, ডায়রিয়া — এগুলো অত্যন্ত সাধারণ।
প্রোবায়োটিক সাধারণত খাওয়ার ৩০ মিনিট আগে নেওয়া ভালো, যাতে পেটে অ্যাসিড কম থাকে এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাঁচতে পারে। দই, ঘোল, টক দই এগুলো বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রোবায়োটিক খাবার এবং প্রতিদিন খাওয়ার অভ্যাস করাই সবচেয়ে ভালো উপায়।
সর্বোপরি, সাপ্লিমেন্ট কোনো জাদুর ওষুধ নয়। সঠিক সময়ে নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি মনে রাখতে হবে — সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম আর নিয়মিত হাঁটার কোনো বিকল্প নেই। সাপ্লিমেন্ট কেবল ঘাটতি পূরণ করে, পুষ্টির মূল উৎস হতে পারে না। যেকোনো সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
লেখক: ফাহিমা হোসেন মুনা। গবেষণা দলের প্রধান, BESS; প্রতিষ্ঠাতা ও কন্টেন্ট রাইটার, Antioxidant Pathways।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)