রবিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০ই ফাল্গুন ১৪৩২


রহস্য উন্মোচন করল পিবিআই

বাসায় কাজে এসে ওষুধ খাইয়ে গৃহকর্ত্রীকে হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:২৮

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

রাজধানীর উত্তরায় গৃহকর্মী সেজে বাসায় ঢুকে বৃদ্ধ দম্পতিকে কড়া মাত্রার চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে স্বর্ণালংকার ও টাকা লুটের ঘটনায় গৃহকর্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। সম্পূর্ণ ‘ক্লু-লেস’ বা সূত্রহীন এই হত্যাকাণ্ডের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে মূল অভিযুক্ত গৃহকর্মী বিলকিস বেগম (৪০) ও চোরাই স্বর্ণের ক্রেতা জুয়েলারি দোকান মালিক রবিউল আউয়ালকে (৫৩)।

রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর পশ্চিম আগারগাঁওয়ের ভাঙ্গা মসজিদে পিবিআই আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা মেট্রো (উত্তর)-এর এডিশনাল ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি অজ্ঞাতনামা এক নারী মাসিক ৫ হাজার টাকা বেতনে উত্তরা পশ্চিম থানার একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেন। কেয়ারটেকারের কাছে নিজের নাম ‘মমতাজ’ এবং বাসার সদস্যদের কাছে ‘মারুফা’ পরিচয় দিলেও তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা ঠিকানা পরে দেবেন বলে জানান।

এর তিন দিন পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে বাসার মালিকের স্ত্রী ও সন্তান বেড়াতে গেলে বাড়িতে শুধু বৃদ্ধ দম্পতি আয়শা আক্তার (৬২) ও আনোয়ার হোসেন (৬৮) অবস্থান করছিলেন। সন্ধ্যায় তাদের বড় ছেলে মো. জাকারিয়া হোসেন ফোনে বাবার অসংলগ্ন কথা শুনে বাসায় গিয়ে দেখেন, তার মা বিছানায় অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন এবং বাবা অসুস্থ হয়ে কাতরাচ্ছেন। তাদের দ্রুত লুবানা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক আয়শা আক্তারকে মৃত ঘোষণা করেন। আনোয়ার হোসেন বর্তমানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।

পিবিআই জানায়, পরিবারের সদস্যরা বাসায় ফিরে দেখেন ঘর এলোমেলো এবং গৃহকর্মী নিখোঁজ। বাসা থেকে ৫ ভরি ১০ আনা ওজনের স্বর্ণালংকার, অন্য কক্ষ থেকে আরও ৬ ভরি স্বর্ণ এবং আলমারি থেকে নগদ এক লাখ টাকা চুরি হয়েছে। পাশের বাসার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১৭ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটে ওই নারী বাসায় প্রবেশ করেন এবং দুপুর আড়াইটার দিকে একটি পলিথিন ব্যাগ হাতে বেরিয়ে যান।

তদন্তে জানা যায়, বিলকিস বেগম পানির সঙ্গে ১০টি চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে ওই দম্পতিকে খাইয়েছিলেন। অতিরিক্ত মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগের ফলেই আয়শা আক্তারের মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় তার ছেলে বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা (মামলা নং-২৭) দায়ের করেন।

এডিশনাল ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ ক্লু-লেস। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও পূর্বের মামলার তথ্যভাণ্ডার (ডেটাবেজ) বিশ্লেষণ করে বিলকিসকে শনাক্ত করা হয়। বিভিন্ন থানার পুরাতন মামলা থেকে তার ছবি সংগ্রহ করে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের দেখালে তারা তাকে চিনতে পারেন। এরপর পিবিআইয়ের একাধিক দল ময়মনসিংহ, জামালপুর ও গাজীপুরে অভিযান চালিয়ে গাজীপুর চৌরাস্তার আউটপাড়া এলাকা থেকে বিলকিসকে গ্রেপ্তার করে। পরে তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বিলকিস বেগম পেশাদার অপরাধী। তিনি বিভিন্ন ছদ্মনামে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গৃহকর্মী সেজে চেতনানাশক প্রয়োগ করে চুরি করে আসছিলেন। খিলক্ষেত, শেরেবাংলা নগর, ভাটারা ও হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

গ্রেপ্তার হওয়া অন্য আসামি রবিউল আউয়াল শেরপুর জেলার বাসিন্দা হলেও গাজীপুরে ব্যবসা করতেন। বিলকিস তার কাছেই চোরাই স্বর্ণ বিক্রি করেছিলেন বলে তিনি স্বীকার করেছেন। বিলকিসের কাছ থেকে নগদ ৬ হাজার ৩০০ টাকা ও ওষুধের খালি পাতা উদ্ধার করা হয়েছে।

গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নাম-ঠিকানা ও এনআইডি যাচাই, মোবাইল নম্বর সংগ্রহ, ছবি সংরক্ষণ এবং স্থানীয়ভাবে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য নাগরিকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা।

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়