বুধবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩ই ফাল্গুন ১৪৩২


১১ ঋণখেলাপির বিজয় নিয়ে ‘প্রশ্ন’ সুজনের

এখনো সুযোগ আছে, জালিয়াতি প্রমাণিত হলে বাতিল হতে পারে ফল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫:৫৩

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬-এর পরেও নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। 

সংগঠনটি জানায়, অন্তত ১১ জন অভিযুক্ত ঋণখেলাপি প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। তবে নির্বাচনের পরও হলফনামায় তথ্য গোপন বা মিথ্যা প্রমাণিত হলে বিজয়ীদের আসন বাতিলের আইনগত সুযোগ নির্বাচন কমিশনের হাতে রয়েছে বলেও জানিয়েছেন সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

তিনি বলেন, আরপিও-এর ৯১ এফ ধারা অনুযায়ী, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য বা তথ্য গোপন হলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত প্রার্থীর আসন বাতিল করতে পারে।

বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘সুজনের দৃষ্টিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কেবল ভোটের দিনের ঘটনা নয়— এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ার আইনি কাঠামো যদি ত্রুটিপূর্ণ হয়, তাহলে ভোট শান্তিপূর্ণ হলেও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সুজন সম্পাদক বলেন, নির্বাচনটা এক দিনের বিষয় নয়। এটা শুরু হয় আইনি কাঠামোর যথার্থতা দিয়ে। আইনি কাঠামো যদি সঠিক হয় এবং তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের অভিজ্ঞতা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। একইভাবে বর্তমান ব্যবস্থায়ও নানা আইনি ঘাটতি রয়েছে, যা সংশোধন না করলে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব : পুরনো সতর্কবার্তা, নতুন বিতর্ক

সুজনের পক্ষ থেকে আগেই নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের কাছে একাধিক সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। তার মধ্যে ছিল— নির্বাচনের কমপক্ষে ছয় মাস আগে ঋণ নিয়মিতকরণের বাধ্যবাধকতা এবং অভ্যাসগত ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা। কিন্তু সেসব প্রস্তাব আইনে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় এবারের নির্বাচনে ঋণখেলাপি প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তিনি বলেন, আমরা বলেছিলাম, যারা অভ্যাসগত ঋণখেলাপি, তাদের কোনোভাবেই নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া যাবে না। যদি এসব প্রস্তাব গ্রহণ করা হতো, তাহলে এখন যে প্রশ্নগুলো উঠছে, সেগুলো এড়ানো যেত।

দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছিল সুজন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে কিছু প্রার্থীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ প্রসঙ্গে ড. বদিউল বলেন, ২৬ জানুয়ারি একটি পত্রিকায় নির্বাচন কমিশনার মাসুদ উল্লেখ করেছিলেন— ঋণখেলাপি বা দ্বৈত নাগরিকত্ব গোপন করলে নির্বাচনের পরও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। “আমরা আশা করি, এখনো যেসব প্রশ্ন আছে, সেগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেন তিনি।

৯১ (এফ): নির্বাচনের পরও বাতিলের ক্ষমতা

ড. বদিউল আলম মজুমদার এসময় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯১ (এফ) ধারার বিষয়ে উল্লেখ করেন। ধারায় বলা আছে, নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি প্রমাণ হয় যে প্রার্থী হলফনামায় ভুল তথ্য দিয়েছেন বা তথ্য গোপন করেছেন, তাহলে নির্বাচন কমিশন তদন্ত করে তার নির্বাচন বাতিল করতে পারে।

তিনি বলেন, এটা শুধু আদালতের বিষয় নয়। নির্বাচন কমিশনেরও এখতিয়ার আছে। আপনারা (সাংবাদিকরা) অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে পারেন। কেউ যদি তথ্য গোপন করে থাকেন, সেটি সামনে আনলে কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, অতীতে গেজেট প্রকাশের পর বিষয়টি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারে চলে যেত। কিন্তু এবার আইনে ৯১(এফ) যুক্ত হওয়ায় কমিশনের নিজস্ব তদন্তের সুযোগ রয়েছে। তবে তিনি আক্ষেপ করেন, নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে অনেক সময় মামলার নিষ্পত্তি মেয়াদকালেই হয় না, যা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির পথে বড় বাধা।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণ : দিন নয়, পুরো প্রক্রিয়া

সুজন এবার শুধু ভোটের দিন নয়, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছে বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ দুইভাবে হতে পারে—একটা ভোটের দিন, আরেকটা পুরো প্রক্রিয়া। ভোটার তালিকা ঠিক আছে কিনা, প্রার্থী হতে বাধা দেওয়া হয়েছে কিনা, প্রার্থীদের তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছেছে কিনা—এসবই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, শুধু ভোটের দিন শান্তিপূর্ণ হলেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। পুরো প্রক্রিয়া যদি সঠিক না হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়।

গণভোট ও শপথ বিতর্ক : নতুন জটিলতা

গণভোটে অনুমোদিত ৪৮টি বিষয়ের বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়া নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক জটিলতা নিয়েও কথা বলেন ড. বদিউল। তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শপথ না নেওয়ার কারণে একটি জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

তবে তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষমতাসীন দল গণভোটে পাস হওয়া বিষয়গুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে তারা কীভাবে তা বাস্তবায়ন করে, বলেন তিনি।

নির্বাচন কেমন হলো?

নির্বাচন কেমন হলো? -এমন প্রশ্নের জবাবে নানা বিতর্কের মাঝেও তিনি কিছু ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যারা ভোট দিতে চেয়েছেন, তারা ভোট দিতে পেরেছেন। নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে। কিছু বিচ্যুতি ছিল, কিছু অশান্তি ছিল, কিন্তু দলগুলো ফলাফল মেনে নিয়েছে— এটা গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, এখন মূল কাজ হলো— উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর তদন্ত, দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ভবিষ্যতে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা কারও পক্ষেও নই, কারও বিপক্ষেও নই। আমাদের লক্ষ্য একটি বিশ্বাসযোগ্য, প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। এখন দেখার বিষয়— ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, নির্বাচন কমিশন সেগুলো কতটা সক্রিয়ভাবে খতিয়ে দেখে।

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়