ঢাকা মঙ্গলবার, ৪ঠা আগস্ট ২০২০, ২১শে শ্রাবণ ১৪২৭


টিকে থাকার অর্থনীতি


প্রকাশিত:
২৩ জুলাই ২০২০ ১০:১০

আপডেট:
২৪ জুলাই ২০২০ ১৭:২১

করোনাভাইরাসের থাবায় বিপর্যস্ত অর্থনীতি। ভেতরে-বাইরে চলছে রক্তক্ষরণ। এর শেষ কোথায় কেউ জানে না। গণমাধ্যমে আসছে নানা খবর। জানাচ্ছে, অভাবের তাড়নায় শহর ছাড়ছে মানুষ।

গণমাধ্যম নিজেও কঙ্কালসার। শুরুতে ছিল; বিজ্ঞাপন নেই। তাই বেতন দিতে দেরি। পরে প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছাঁটাই। বেতন কমানোর খড়গ তো ঝুলছেই। ষোলকলা পূর্ণ করেছে করোনাভাইরাস।

কবে যাবে করোনা মহামারি?

এ নিয়ে তিনটি তত্ত্ব আছে।

প্রথমতঃ এবং যেটার সম্ভাবনাই বেশি, দুই বছরের মধ্যে এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। মারা যাবে প্রায় দশ লাখ মানুষ। মানুষ দ্রুতই এই বিভীষিকা ভুলে তাদের পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাবে।

দ্বিতীয়তঃ মহামারি প্রায় পাঁচ বছর স্থায়ী হতে পারে। মারা যেতে পারে দশ কোটি মানুষ। এর ধাক্কা সামলাতে লাগবে আরও পাঁচ বছর। অর্থনৈতিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠা অনেক কঠিন হবে। যেমনটি ঘটেছিল স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির পর।

তৃতীয়তঃ মহামারি দশ বছরের বেশি স্থায়ী হতে পারে। দশ থেকে তিরিশ কোটি মানুষ মারা যাবে। ইত্যাদি।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বলছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে দেশে প্রায় চার কোটি নতুন দরিদ্র তৈরি হবে। গ্রামাঞ্চলে এই নতুন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হবে প্রায় তিন কোটি এবং শহরাঞ্চলে এক কোটি। বর্তমান দারিদ্র হারের সঙ্গে এই বিপুল নতুন দরিদ্র মিলে বাংলাদেশে দারিদ্র হার হতে পারে ৪১ শতাংশ।

৬০ লাখ চাকরি দীর্ঘ মেয়াদের জন্য হারিয়ে যাবে। যা দেশের মোট শ্রমশক্তির ১০ শতাংশ। করোনার প্রভাবে দেশে ৯৫% পরিবারের উপার্জন ক্ষতিগ্রস্ত। বলছে ওয়ার্ল্ড ভিশন। সাধারণের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।

ধরা যাক, মহামারি দুই বছর স্থায়ী হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমি/আমরা কি করতে পারি ভেবে দেখা দরকার।

শুরু হোক আলোচনা। এটাই প্রথম পদক্ষেপ হওয়া প্রয়োজন। সম্ভাব্য যত দিকে সম্ভব যোগাযোগ করা। তথ্য যোগাড় করা। তথ্য বিনিময় করা। রীতিমত গবেষণার ভিত্তিতে এগোনো। দশজন দশজন করে একেকটি ইউনিট হতে পারে। রীতিমত ব্যবসায়ী ইউনিট। প্রতিটি ইউনিট সম্ভাব্য ব্যবসার পুরো রূপরেখা তুলে ধরবে। সবচেয়ে কম পূঁজিতে বেশি লাভ কিভাবে সম্ভব খুঁজে বের করতে হবে।

সবগুলো ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় থাকবে। সব ইউনিট একই ধরণের ব্যবসা করবে না। যাতে মার খেলে ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিটটিকে অন্য ইউনিটগুলো টেনে তুলতে পারে।

গবেষণায় করোনা পরবর্তী সময়ে কৃষি, খাবার প্রসেসিং, তৈরি পোশাক, চিকিৎসা-সামগ্রী উৎপাদন, স্বাস্থ্য ও ফার্মাসিউটিক্যালস, যানবাহন, নির্মাণ, খুচরা ব্যবসা ইত্যাদি খাত আগে ঘুরে দাঁড়াবে বলে বলা হচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী তৈরির বিষয়ে কাজ করলে এই খাতটিও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। কারণ মাস্ক, গ্লাভস, পিপিই'র মতো সামগ্রীর চাহিদা দেশ-বিদেশে রয়েছে এবং থাকবে।

কোন নির্দিষ্ট চিন্তা কাজ নাও করতে পারে। নতুন চিন্তা ও অনুসন্ধান নতুন পথ দেখাতে পারে।
গল্পটা হচ্ছে, গ্রামীণফোন বাজারে আসার আগে বিদেশি একটি কোম্পানীকে দিয়ে মার্কেট সার্ভে করিয়েছিল। সার্ভে রিপোর্টে বলা হল, বাংলাদেশে বড়জোর সাত লাখ মোবাইল ফোন চলতে পারে। রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ড. ইউনূস। পরেরটুকু ইতিহাস।

আসুন আমরা সবাই মিলে এই দূযোগ মোকাবিলা করি। নতুন নতুন পন্থা উদ্ভাবন করি, দশে মিলে করি কাজ। ছোট ছোট যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে আগত দূযোগ মোকাবিলা করি।

দেশের কল্যাণে আপনার পরামর্শ লিখে পাঠাতে পারেন বা কমেন্ট বক্স এ দিতে পারেন।

টিকে থাকার অর্থনীতি- ২

করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে জনশক্তিকে নিয়ে স্বনির্ভরভাবে টিকে থাকার চেষ্টায় যেসব পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে:

১.আউট সোর্সিং:
জনশক্তির জন্য আউট সোর্সিং বিকল্প আয়ের বড় উৎস হতে পারে। আগ্রহী জনশক্তিকে স্বল্পতম সময়ে নিবিড় প্রশিক্ষণ দিয়ে এ প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে। প্রশিক্ষক/রিসোর্স পারসন এমন কেউ হবেন যাতে করে তিনি ফিভার বা আপওয়ার্কে কাজ ধরিয়ে দিতে পারেন। জানাশোনাদের সাথে এ ব্যাপারে পরামর্শ করা যেতে পারে। যেসব আউট সোর্সিং কমিউনিটি রয়েছে তাদের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে লোন পাওয়ার সুযোগ আছে।

প্রশিক্ষিত জনশক্তিকে নিয়ে সম্ভব হলে নির্দিষ্ট অফিস করে আউট সোর্সিং করা যেতে পারে। সেই অফিস অনলাইন নিউজ পোর্টালের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে এবং আরও অনেক কিছু...। এ অফিস সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা সম্ভব যা পরের আলোচনায় আসবে।

২.অনলাইনে খাদ্য সামগ্রী বিক্রি:
করোনাভাইরাস মহামারীর এ সময়ে তৈরি খাবার বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে। এমনকি আটার বা চালের রুটিও অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে। ডাল-ভাত ডট কম, গোস্ত-রুটি ডটকম বা পিঠাঘর ডটকম নামের সাইট খুলে তৈরি খাবার বিক্রি শুরু করা যেতে পারে।

১ নম্বর পয়েন্টে যে আউট সোর্সিং অফিসের কথা বলা হয়েছে সেখান থেকে এসব ওয়েবসাইট খোলা, নিয়ন্ত্রণ, প্রচার, বিক্রির অর্ডার গ্রহণ করা যেতে পারে। সাধারণত কোন পণ্য বিক্রির সাইটকে জনপ্রিয় করতে হলে বা (সাইট এঞ্জিন অপটিমাইজেশন) এসইও বাড়াতে হলে নিজেরাই সেখানে অপ্রয়োজনীয় সার্চ বা অর্ডার দিতে হয়। সে কাজটি এ অফিস থেকে করা সম্ভব।

পুরো মহানগরীকে জোন আকারে ভাগ করা যেতে পারে। যেখান থেকে অর্ডার আসবে সে এলাকার নির্দিষ্ট সদস্যদের বাড়ি থেকে তৈরি খাবার সরবরাহ করা হবে। কিংবা আরও বিকল্প চিন্তা করা যেতে পারে।

অর্ডার পাওয়া খাদ্য কে পৌছে দেবে? নির্দিষ্ট জোনের সদস্যরা নিজেরাই তা পৌছে দিতে পারেন। কিংবা কুরিয়ার সার্ভিস...

৩. নিজস্ব কুরিয়ার সার্ভিস গড়ে তোলা:
করোনাভাইরাস কালে জমজমাট ব্যবসা করছে কুরিয়ার সার্ভিসগুলো। এ সময়ে বেকারের সংখ্যা প্রচুর হওয়ায় তাদের নিয়ে নিজ¯^ কুরিয়ার সার্ভিস চালু করা সম্ভব। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করে এর কাজকর্মের ধরণসহ বিস্তারিত জেনে নিতে হবে।

৪.অনলাইনে কাপড় বা কাঁথা বিক্রি:
এ সময়ে অনলাইনে কাপড় বা কাঁথা বিক্রিরও ধুম চলেছে। আউট সোর্সিং অফিস বা কুরিয়ার সার্ভিসকে কাজে লাগিয়ে লাভজনক এ ব্যবসায়ে নামতে পারেন একদল কর্মী। কাঁথা বা নকশী কাঁথা বিদেশে রপ্তানী হচ্ছে। সে সুযোগও নেয়া যেতে পারে।

৫.সরকারি বিভিন্ন দফতরে কন্ট্রাক্টরির কাজ করা:
জনশক্তির যে পরিমাণ পরিচিতি রয়েছে তাতে করে তারা সরকারি বিভিন্ন দফতরে সরবরাহ বা ঠিকাদারির কাজ ঠিকই বের করে আনতে পারবেন। সরবরাহ করার মত যথেষ্ট আর্থিক ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে সম্মিলিতভাবে সবাই দাঁড়ালে এটা কোন সমস্যা হবে না। অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে এগোনোটা ভাল হবে।

৬. সবজি, মাছ, হাঁস, ডিম উৎপাদন:
জনশক্তির অনেকেরই পরিচিত ল্যান্ড ডেভোলাপার রয়েছেন। তাদের অনুমতি বা ইজারা নিয়ে পড়ে থাকা জায়গায় সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন বা ডিম উৎপাদন করা সম্ভব। আশপাশের জায়গা বা পুকুর ইজারা নিয়ে সবজি, মাছ, হাঁস, ডিম উৎপাদন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রেও ব্যাংক থেকে লোন পাওয়ার সুযোগ আছে।

৭. মাস্ক, পিপিই’র ব্যবসা:
করোনাভাইরাস মহামারীর এ সময়ে দেশে-বিদেশে মাস্ক, পিপিইসহ নিরাপত্তা সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সম্ভব হলে নিজেরা এগুলোর উৎপাদনে যেতে হবে। আর তা না হলে উৎপাদক ও ক্রেতার মধ্যস্থতার ব্যবসায় নামতে হবে।

৮. খোঁজ-খবর ও পরামর্শ নেয়া:
যারা ইতিমধ্যে ব্যবসা-বানিজ্যে সংশ্লিষ্ট আছেন তাদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। আরও কি করা যেতে পারে সে ব্যাপারে তারা ভাল পরামর্শ দিতে পারবেন।
পাশাপাশি, তাদের ব্যবসার সাথে অন্যরা যোগ দিয়ে লাভবান হতে পারবেন কিনা সে খোঁজও নিতে হবে।

আবু তাহির মুস্তাকিম
গণমাধ্যম কর্মী
[email protected]



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top