ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ৬ই মে ২০২১, ২৩শে বৈশাখ ১৪২৮


সংক্রমণে অশনিসংকেত সতর্কতা খুবই জরুরি


প্রকাশিত:
২৯ মার্চ ২০২১ ০৯:১৯

আপডেট:
৬ মে ২০২১ ০৬:০০

করোনা মহামারী শীতে বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তখন করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন গরমের সময় করোনার আক্রমণ বেড়ে চলছে। তা খুবই আতঙ্কের বিষয়। আমরা করোনাকে অবহেলা করে চলছি। এ জন্য আজকের এই অবস্থা। দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত শনিবার ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এটি গত সাড়ে তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত ১৫ ডিসেম্বর করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এ নিয়ে করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৮৬৯-এ। এ ছাড়া গত শনিবার ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৬৭৪ জন। অর্থাৎ মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৯১ হাজার ৮০৬-এ। নতুন করে ভাইরাস থেকে সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৯৭১ জন। এ নিয়ে মোট সুস্থ হয়েছেন ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৯২২ জন।

নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনিবার ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। তা আমাদের জন্য অশনিসংকেত। শনাক্তের সংখ্যা অনেক নিচে নেমে আসছিল। এখন আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন আমাদের অধিকতর সতর্ক হতে হবে। অন্যথায় আরও খারাপ পরিস্থিতি হতে পারে। মোট পরীক্ষায় এ পর্যন্ত শনাক্তের হার ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় মোট মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৫০ শতাংশ। আর শনাক্ত বিবেচনায় মোট সুস্থতার হার ৯০ দশমিক ২২ শতাংশ। গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর ১৮ মার্চ প্রথম একজনের মৃত্যুর কথা জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, এতে সামনে মৃতের সংখ্যা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। গত এক সপ্তাহে যারা মারা গেছেন, তাদের অধিকাংশ আক্রান্ত হয়েছিলেন দুই-তিন সপ্তাহ আগে। তখন শনাক্ত কম ছিল। কিন্তু এখন যেভাবে দিনে সাড়ে তিন হাজার বা এর চেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন, এতে আগামী দিনগুলোয় মৃতের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থেকে যায়। তবে কেউ কেউ মনে করছেন, টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার ১৪ দিন পর থেকে আবার মৃত্যু কমে আসবে। যারাই এখন করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে বাড়িতে অক্সিমিটার ব্যবহার। অক্সিজেন সেচুরেশন কমতে থাকলেই হাসপাতালে জরুরি নিয়ে যেতে হবে। হাসপাতালে যাওয়ার পর যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা হলে হয়তো মৃত্যু কমিয়ে রাখা সম্ভব হবে। ফলে রোগী ও হাসপাতাল- সবার সতর্ক উদ্যোগ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা এ সময়ে খুবই জরুরি। প্রয়োজনে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। বিভিন্ন বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হবে- যাতে মানুষ সভা-সমাবেশ, বাজারে চায়ের আড্ডা, গণপরিবহনে আরও সতর্ক হতে হবে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে, সবাইকে মাস্ক পরায় বাধ্য করতে হবে, নতুবা জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন পয়েন্টে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষ মাস্ক না পরলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তা হলে মানুষ ভয়ে সতর্ক হবে।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন যারা বিভিন্ন হাসপাতালে যাচ্ছেন, তাদের একটি অংশকে নিতে হচ্ছে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ)। সেখানে নিয়েও বেশিরভাগকেই বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। যারা আইসিইউয়ে যাচ্ছেন, তাদের ৯০ শতাংশকেই আর ফেরানো যাচ্ছে না। এমনকি ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দিয়েও বাঁচানো যাচ্ছে না তাদের। আইসিইউয়ের জন্য হাহাকার করছে মানুষ। কিন্তু আইসিইউ পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ আইসিইউ আমাদের হাসপাতালে পর্যাপ্ত নেই। রোগীর তুলনায় আইসিইউয়ের সংখ্যা সীমিত। প্রতিটি হাসপাতালে প্রতিদিন আইসিইউ পেতে আবেদনের সংখ্যা জমা পড়ছে অনেক, আকুতি-দেনদরবার চলছে। কিন্তু পর্যাপ্ত আইসিইউ না থাকায় হতাশ হয়ে অনেকেই সাধারণ শয্যা বা কেবিনে ভর্তি হতে হচ্ছেন। সেখানেই অনেকের মৃত্যু হচ্ছে। তা খুবই দুঃখজনক। এ জন্য দরকার আমাদের নিজস্ব অধিকতর সতর্কতা। নিজে সচেতন হতে হবে এবং অন্যকে সচেতন করতে এগিয়ে আসতে হবে।

করোনার আগে অনেকেই নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। তারা করোনায় আক্রান্ত হয়েও প্রথম দিকে গুরুত্ব না দিয়ে বাড়িতে সময় পার করেন। এ জন্য অনেক সমস্যা দেখা যায় এবং সংকটে পড়তে হয় হাসপাতালের। কারণ যখন অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে, তখন তাদের স্বজনরা হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এ ধরনের রোগীর অনেককে অক্সিজেন বা হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার সাপোর্ট দিয়ে সুস্থ করা গেলেও অনেকের আইসিইউ সাপোর্ট দরকার হয়। কিন্তু ততক্ষণে তাদের ফুসফুসসহ অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে, আইসিইউয়ে নিয়েও আর বাঁচানো সম্ভব হয় না। তাই আমরা আমাদের জীবনকে নিয়ে হেলাফেলা না করি। একটু করোনায় আক্রান্তের ঝুঁকি অনুভব করলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আমি অনুরোধ করব, বয়স্ক মানুষ ও যে বয়সেরই হোক- যদি আগে থেকে জটিল কোনো রোগ থাকে এবং তাদের করোনায় আক্রান্ত বা উপসর্গ দেখা দেয়, তা হলে অবশ্যই দেরি না করে শুরুতে হাসপাতালে নিতে হবে। এতে সাধারণ অক্সিজেন বা হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার সাপোর্টেই তারা সুস্থ হয়ে যেতে পারেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে গত শনিবার ঢাকায় আট-দশটি বড় হাসপাতালের ১০৮টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে মাত্র তিনটি হাসপাতালে পাঁচটি খালি ছিল। বেসরকারিতেও দেখা দিচ্ছে আইসিইউ সংকট। ঢাকার ১০টি বেসরকারি হাসপাতালের ১৮৮টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে খালি ছিল ৪৫টি। অন্যদিকে সারাদেশে ৫৭৪টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে ৩৪৮টিতে রোগী ছিল। ফাঁকা ছিল ২২৬টি। এর বেশিরভাগই ঢাকার বাইরে। তবে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ঢাকায় বেশি থাকায় আইসিইউ শয্যার চাহিদাও এখানে সর্বোচ্চ।

বস্তুত এ মহামারীর সময় আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকারি ও বেসরকারি খাতের নজিরবিহীন পারস্পরিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে- যাতে সবাই মিলে করোনাকে মোকাবিলা করতে পারি। সরকার শুধু চেষ্টা করলে হবে না, জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের দেওয়া নির্দেশনা আমাদের সবাইকে মেনে চলতে হবে। প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লকডাউন দিতে হবে। ওই এলাকাগুলো শনাক্ত করতে হবে। সেখানে বেশি মনিটরিং ও তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতি এলাকায় জনসচেতনতামূলক কমিটি করতে হবে- যারা বিভিন্ন এলাকায় প্রচার ও মাইকিং করে মানুষকে সচেতন করবেন। লক্ষ করা গেছে, বিভিন্ন হোটেলে নো মাস্ক নো সার্ভিস লেখা রয়েছে। কিন্তু হোটেলের কর্মকর্তারা মাস্ক পরছেন না, এমনকি সরকারি অফিসে দেখা গেছে একই অবস্থা। এখানে সরকারের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এগুলো বন্ধ করতে হবে। নতুবা আরও খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি অফিসের কর্মকর্তাদের অনেক তৎপর হতে হবে- যাতে এ ধরনের কাজ থেকে সবাই সতর্ক থাকেন। সবাইকে মাস্ক পরায় উৎসাহ দিতে ও করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে জানাতে হবে। করোনার টিকা দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে- এটিই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু মানুষকে টিকা নেওয়ার বিষয়ে উৎসাহ দিতে ও আমাদের সবার টিকা নিতে হবে। এটি অনেকটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ভ্যাকসিন, রোগ নির্ণয়, স্যানিটেশন ও রোগের গতি-প্রকৃতির দিকে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা মহামারী প্রতিরোধের প্রধান শর্ত। এ কারণে এসব খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। করোনার বিষয়ে সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে গেলে সব অফিস ও দপ্তরকে আরও তৎপর হতে হবে। বিভিন্ন নির্দেশনামূলক কাজ আমাদের মেনে নিতে ও বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক কাজ ব্যবহারের জন্য জনসাধারণকে উৎসাহ দিতে হবে- যাতে করোনা প্রতিরোধ করতে পারি।

শফিকুল ইসলাম : শিক্ষক ও সাবেক সভাপতি- শিক্ষক সমিতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top