মিশেল লরেন্টের গণহত্যা সাক্ষ্য
প্রকাশিত:
২৫ মার্চ ২০২৫ ১১:০৯
আপডেট:
২৮ মার্চ ২০২৫ ১৬:৫৪

ছবি সংগৃহীত
ফরাসি যুবক মিশেল লরেন্ট বাল্যকালে লুকোচুরি খেলায় পারদর্শী ছিলেন কিনা সে বিষয়ে তথ্য পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ২৫ বছর বয়স্ক অ্যাসোসিয়েটস প্রেসের ফটোসাংবাদিক ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে রীতিমতো লুকোচুরিই খেলেছিলেন।
২৫ মার্চ কালরাতে বর্বর ক্র্যাকডাউনের পর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান করা অর্ধ-শতাধিক সাংবাদিককে দেশত্যাগে বাধ্য করে পাকিস্তানি সেনা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দুইজন সাংবাদিক পাকিস্তানি সেনাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে হোটেলে লুকিয়ে ছিলেন। তারা হলেন, দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার সায়মন ড্রিং ও এপি’র ফটোসাংবাদিক মিশেল লরেন্ট।
সায়মন লুকিয়ে ছিলেন হোটেলের ছাদে এয়ারকন্ডিশনারের কক্ষে আর মিশেল লুকিয়ে ছিলেন হোটেলের হলরুমের একটি টেবিলের নিচে। টেবিলটি সাদা কাপড় দিয়ে আবৃত ছিল। যার ওপরে ছিল প্লেট, পিরিচ ও বিভিন্ন ধরনের চামচ। ঠিক যেন বাল্যকালের লুকোচুরি খেলা।
মিশেল লরেন্ট এই লুকিয়ে থাকা এবং পরের কয়েকদিন ঢাকায় গণহত্যার তথ্য-উপাত্ত ও ছবি সরেজমিনে সংগ্রহের ইতিবৃত্ত জানিয়েছেন কালজয়ী সাংবাদিক সায়মন ড্রিং। ২০১৩ সালে সায়মন যোগ দিয়েছিলেন সম্প্রচারের অপেক্ষায় থাকা ২৪ ঘণ্টার সংবাদভিত্তিক টিভি চ্যানেল যমুনা টিভি’তে। সে সময় আমিও কর্মরত ছিলাম। কয়েকদিনের আলাপচারিতায় সায়মন আমার কাছে তুলে ধরেছিলেন যুদ্ধদিনের তার অনন্য অভিজ্ঞতা। যে আলাপচারিতার বড় অংশজুড়ে ছিলেন মিশেল লরেন্ট।
সায়মনের ভাষ্য অনুযায়ী, মিশেলের কথা তাকে প্রথম জানান হোটেলের এক স্টাফ। এরপর মিশেলের সাথে তার দেখা হয় নিচের রেস্টুরেন্টে। সায়মন ও মিশেল জানতেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার ও সরকারের প্রেস লিয়াজো অফিসার সিদ্দিক সালিকের হুমকি অমান্য করে ঢাকায় থেকে যাওয়া তাদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
এতে তাদের প্রাণ সংশয় রয়েছে। যদিও দুইজনই ছিলেন ঝানু সাংবাদিক। যুদ্ধ ও বিদ্রোহ পরিস্থিতিতে সংবাদ সংগ্রহ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে। তাই তারা ভেবেছিলেন, একজন সংবাদ প্রতিবেদন ও একজন ফটো সাংবাদিক মিলে ভালো কাজ করা যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরাতন ঢাকায় মিশেল লরেন্ট
২৬ মার্চ ছিল কারফিউ। ২৭ মার্চ স্বল্প সময়ের জন্য কারফিউ তুলে নেয় পাকিস্তানি সেনা কর্তৃপক্ষ। এই ফাঁকেই হোটেল থেকে বের হন মিশেল ও সায়মন। তাদের বাহন একটি বেকারি ভ্যান। পোশাক পাঞ্জাবি-পাজামা। নিজেদের নিরাপদ রাখতেই পাঞ্জাবি-পাজামা পড়েছিলেন এই দুইজন।
অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্বর আক্রমণ চালিয়েছিল পাকিস্তানি সেনারা। জগন্নাথ হল ছিল আক্রমণের মূল লক্ষ্য। আর ১৯৭১ সালে ছাত্র রাজনীতিবিদদের আবাসস্থল ছিল জহুরুল হক হল। ওই হলেও বর্বর আক্রমণ পরিচালিত হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ নিয়ে আঁতকে ওঠার মতো একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত করেছিল দ্য টাইমস। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ প্রকাশিত সংবাদটির শিরোনাম ছিল, ‘At Dacca University Burning Bodies of Students Still Lay in Their Beds … A Mass Grave Had Been Hastily Covered …’। এর প্রতিবেদক ছিলেন মিশেল লরেন্ট।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে মিশেল দ্য টাইমস এর সংবাদকর্মী ছিলেন না, তিনি মূলত ছিলেন এ.পি. (অ্যাসোসিয়েটস প্রেস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সংস্থা) এর ফটোসাংবাদিক। দ্য টাইমস সংবাদপত্রে এই প্রতিবেদনটি এপি’র বরাত দিয়েই ছাপা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে মিশেল তুলে ধরেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের বিস্তারিত বিবরণ।
প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ও ইকবাল হলের (বর্তমান জহুরুল হক হল) হত্যাযজ্ঞের বর্ণনায় মিশেল তুলে ধরেন 'At the university burning bodies of some students still lay in their dormitory beds. The dormitories had been hit by direct tank fire. A mass grave had been hastily covered at the Jagannath College [Actually, Jagannath Hall of Dhaka University] and 200 students were reported killed in Iqbal hall. About 20 bodies were still lying in the grounds and the dormitories. Troops are reported to have fired bazookas into the medical college hospital, but the casualty toll was not known’. (Assignment Bangladesh ’71: 1999;166)
জগন্নাথ হলের গণকবর, বিছানায় পড়ে থাকা মরদেহ, জহুরুল হক হলের মাঠে শুয়ে থাকা শহীদদের আত্মত্যাগ সব কিছুই তুলে ধরেছিলেন মিশেল।
মিশেল লরেন্টর ভাষ্য অনুযায়ী, অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম দুই দিনের হত্যাযজ্ঞে প্রায় ৭০০০ মানুষ হত্যা করা হয়। যাদের অনেকেই হত্যা করা হয় পুরাতন ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায়। এপি’র প্রতিবেদনে মিশেল তুলে ধরেছেন,
‘In two days and nights of shelling by the Pakistani Army perhaps 7,000 Pakistanis died in Dacca alone. The Army, which attacked without warning on Thursday night with American-supplied M24 tanks, artillery and infantry, destroyed large parts of the city. Its attack was aimed at the university, the populous Old city was Sheikh Mujibur, the Awami League leader, has his strongest following, and the industrial areas on the outskirts of this city of 1,500,000 people. (Assignment Bangladesh ’71: 1999;166)
ওই প্রতিবেদনে এক ভীতিকর ঢাকা শহরের বর্ণনাও তুলে ধরেছেন মিশেল। তিনি উল্লেখ করেছেন, কারফিউ তুলে নেওয়ার পরেই মানুষের স্রোত নামে ঢাকার রাস্তায়। যে যেভাবে পেরেছেন ঢাকা ছেড়েছেন। সামান্য ব্যাগ, বস্তা যা নেওয়া সম্ভব তাই হাতে করে ঘর ছেড়েছেন ঢাকার মানুষ।
আর সময় ঢাকার রাস্তায় ছিল পাকিস্তানি আর্মি জিপের টহল। ফুটপাতে তখনো পড়ে ছিল গুলিবিদ্ধ মরদেহ। পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে মানুষ ভয়ে গাড়ির সামনে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উড়িয়েছেন। মানুষ ছিল ভীত, হতভম্ব। মিশেলের ভাষায়, ‘Army lorries and armored cars patrolled the almost deserted streets. Cars were pasted with Pakistan flags to avoid drawing fire from the Army patrols. Bodies still lay sprawled in the streets where they had been caught in the Army cross-fire. Shanty towns by the railway had been burnt down. The people still appeared stunned by the shooting and death.’ (Assignment Bangladesh ’71: 1999;166)
ওই প্রতিবেদনে মিশেল আরও তুলে ধরেছিলেন, সরকারের কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও খুব সামান্য পরিমাণ মানুষ কাজে যোগ দেন। পুরো শহর ছিল ভীত ও আতঙ্কিত।
হারিয়ে যাওয়া গণহত্যা ছবি ও সায়মনের আক্ষেপ
২৭ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে ফেরার পর সায়মন ও মিশেলের প্রধান চিন্তা ছিল কীভাবে ঢাকা ত্যাগ করা যায়? কারণ তাদের হাতে তাজা প্রতিবেদন আর দুর্দান্ত সব ছবি ছিল। যা পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার জ্বলন্ত প্রমাণ। ওই সময় পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ এয়ার টিকেটের বিপরীতে নম্বর স্লিপ দিত, যা তাদের ছিল না। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের বাঙালি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় মিশেল ও সায়মন জার্মান নাগরিকের কাছ থেকে দুটো নম্বর জোগাড় করেছিলেন।
তখন মিশেল ও সায়মনের মূল চিন্তা ছিল তাদের ক্যামেরা, ফিল্ম ও রিপোর্টের নোটগুলোর নিরাপত্তা। তারা সহযোগিতার জন্য প্রথমে যান ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশনে। কিন্তু দূতাবাস কর্মকর্তা তাদের জানান, কোনোভাবেই কিছু করা সম্ভব নয়। সেখান থেকে তারা যান জার্মান এম্বাসিতে। সেখানে তারা সহযোগিতার আশ্বাস পান।
দূতাবাস কর্তৃপক্ষ ডিপ্লোম্যাটিক ট্যাগ লাগিয়ে মিশেলের ফিল্মগুলো পাঠাতে রাজি হয়েছিল। সেই আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে মিশেল তোলা ছবির অর্ধেক ফিল্ম (৯ রোল ছবি) জার্মান এম্বাসিতে জমা দিয়ে আসেন। এম্বাসি কর্তারা জানিয়েছিলেন বন (তৎকালীন জার্মান রাজধানী)-এ পৌঁছার পর তারাই এপি’কে ফোন করবে। আর তখন এপি কর্তৃপক্ষ ছবির ফিল্মগুলো নিয়ে যেতে পারবে।
সায়মন ড্রিং জানান, মিশেলের ওই রিলগুলো আর বনে পৌঁছায়নি। তাদের ধারণা মেজর সিদ্দিক সালিক সব জেনে গিয়েছিলেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ সে সময় হয়তো সব ডিপ্লোম্যাটিক ডকুমেন্ট আলাদা করে নিরীক্ষা করেছিল, তাতেই হয়তো জব্দ হয় গণহত্যার ছবির রিলগুলো। আর মিশেলের কাছ থাকা বাকি ছবির রিলগুলো জব্দ হয়েছিল করাচি বিমানবন্দরে। সেখানে তাদের কঠিন তল্লাশির মুখে পড়তে হয়েছিল।
সেবার একেবারেই বিবস্ত্র করে পাকিস্তানি সেনারা তাদের তল্লাশি করেছিল। এভাবেই হারিয়ে যায় ঢাকার বুকে ২৫ মার্চ কালরাত থেকে চলা হত্যাযজ্ঞের দালিলিক প্রমাণ। তবে মিশেল একটি ছবি রক্ষা করতে পেরেছিলেন। জহুরুল হক হলে পড়ে থাকা মরদেহের একটি ছবি তিনি তল্লাশি থেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। যা এখন আমাদের ইতিহাসের অংশ।
ঢাকায় প্রত্যাবর্তন
প্রথম দফায় ঢাকা-করাচি-কলম্বো রুটে নানা ঝক্কিঝামেলা পার হয়ে ব্যাংককে পৌঁছেছিলেন সায়মন ও মিশেল। এরপর দেশ স্বাধীন হওয়ার দিনেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে কলকাতা হয়ে ঢাকায় আসেন সায়মন ও মিশেল। এবার মিশেলের সঙ্গে ছিলেন এপি’র আরেকজন বিখ্যাত সাংবাদিক হ্রস্ট ফাস। জার্মান এই ফটো সাংবাদিক ও মিশেল মিলেই ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন ১৮ ডিসেম্বরের এক ঐতিহাসিক এক ফটোস্টোরি। সেই ফটোস্টোরির জন্য মিশেল ও হ্রস্টে পুলিৎজার পুরস্কার জিতেছিলেন। সাথে জিতেছিল ওয়ার্ল্ড প্রেসফটো পুরস্কার।
বাংলাদেশের যুদ্ধদিনের এই সৈনিক ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিহত হন। সায়মন ড্রিং জানিয়েছেন, ভিয়েতনামে ভিয়েকং যোদ্ধারা খুব কাছ থেকে গুলি করে মিশেল লরেন্টকে হত্যা করে। মিশেলই ছিলেন ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিহত শেষ সাংবাদিক।
তথ্যসূত্র:
১. Assignment Bangladesh ’71, (1999), A Compilation by Maudood Elahi, Dhaka: Momim Publications.
২. মিনহাজ, রাহাত (২০১৬), সায়মন ড্রিং ও অন্যান্যের একাত্তর, ঢাকা, শ্রাবণ।
৩. সায়মন ড্রিং, সাক্ষাৎকার, নভেম্বর, ২০১৩।
৪. আবেদ খান, সাক্ষাৎকার, ফেব্রুয়ারি, ২০১৯।
৫. রায়, সুধাংশু (২০১৫), রিপোটিং, ঢাকা: বাংলা একাডেমী।
রাহাত মিনহাজ ।। সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
minhaz_uddin_du@yahoo.com
সম্পর্কিত বিষয়:
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: