ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ৬ই মে ২০২১, ২৩শে বৈশাখ ১৪২৮


মুনিয়ার খুনের বিচার চাই


প্রকাশিত:
২৯ এপ্রিল ২০২১ ১৫:১২

আপডেট:
৬ মে ২০২১ ০৬:৩৪

মোসারাত জাহান মুনিয়া। ফাইল ছবি

উনিশ বছর বয়সী একটা মেয়ে, যার একটা সময় খুব সুন্দর একটা পরিবার ছিলো, তারপর তার বাবা-মা মারা গেলো, বড় বোনের বিয়ে হয়ে অন্যের ঘরে চলে গেছে আগেই, এদিকে ভাইও বাসা থেকে তাড়ানোর জন্য পাগল হয়ে গেছে। কোথায় যাবে মেয়েটা? থাকবে কোথায়? খাবে কী? সামনে এসএসসি পরীক্ষা, পড়াশোনা কীভাবে চালাবে? তারউপর দেখতে সুন্দরী, মানুষের কুদৃষ্টি আর কুপ্রস্তাবের শেষ নাই।

এমন সময় পরিচয় হলো একটা লোকের সাথে। লোকটার বয়স চল্লিশ হলেও দেখে আরও কমবয়সী মনে হয়। লোকটাকে নিজের সবকথা খুলে বলার পর লোকটা অনেক সহমর্মিতা দেখালো, অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলে মনের জোর এনে দিলো। কতদিন কেউ এভাবে কথা বলে না! বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে শুধু বোঝাই মনে হয় নিজেকে। মনে হয়, আমি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেই বুঝি সবাই বেঁচে যায়। আপন ভাই দেখে না, ঘরে জায়গা দেয় না, বোন খোঁজখবর নিলেও তারও তো সংসার আছে, সে আর কীইবা করবে?

এখন তাহলে বুঝতেই পারছেন যে মুনিয়া মেয়েটার এমন কেউ ছিলো না। তার পাশে একটা মানুষ ছিলো, যে দিনশেষে তাকে একটু আশার কথা বলবে? ছিলো না। একদিন আনভীর নামের লোকটা এসে অনেক আশার কথা বললো। বললো, ওর আর থাকা খাওয়া নিয়ে ভাবতে হবে না, পড়াশোনা নিয়ে ভাবতে হবে না। মুনিয়া অবাক হয়ে গেলো। এই মানুষটা এত ভালো? লোকটার অনেক টাকা বুঝা যায়, তারপরেও এই যুগে কোনও স্বার্থ ছাড়া অপরিচিত একটা মেয়ের জন্য এতকিছু কেউ কেন করে?

বোকা মুনিয়া, অল্পবয়সী মুনিয়া, দুনিয়া না দেখা মুনিয়া জানতো না যে এইসব কোনও কিছুই 'স্বার্থ ছাড়া' না। সবই শুধু তার সুন্দর মুখ আর শরীরটাকে ভোগ করার জন্য।

লোকটা বলেছিলো তাকে বিয়ে করবে। মুনিয়া সেটাই বিশ্বাস করে বসে আছে। একদিন লোকটা তাকে বিয়ে করবে। একা এতবড় ফ্ল্যাটে থাকতে খারাপ লাগে, তাই একটা বিড়াল এনে রেখেছিলো।

লোকটার আচরণ বদলাতে থাকলো দিনদিন। এদিকে বিয়েও করছে না। কিন্তু মুনিয়ার কি ফেরত আসার উপায় আছে? ততোদিনে সে জেনে গেছে এই লোক কে, তার ক্ষমতা কতদূর।

মডেল তিন্নির কথা মনে আছে, যাকে লাশ হয়ে যেতে হয়েছিলো প্রতিবাদ করায়? প্রভার কথা মনে আছে, যার গোটা ক্যারিয়ার ভেঙেচুরে যায় প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ডের ছড়িয়ে দেওয়া ভিডিওর কারণে?

এত বড় বড় মডেল-অভিনেত্রীরা যেখানে অসহায়, মুনিয়া সেখানে কোন ছাড়? সে চাইলেও পারতো না আনভীরের বেড়াজাল থেকে বের হয়ে আসতে। যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে আনভীর নিজেই ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। এত সোজা না এতবড় শিল্পপতির আমোদ-প্রমোদের আসর ভেঙে উঠে আসা। লাশ হয়ে যেতে হতো তাকে।

অবশ্য সেই লাশ তাকে হতেই হলো। হত্যা না, আত্মহত্যা আসলে কেউ জানে না। সবাই শুধু জানে যে সে ছিলো 'রক্ষিতা', 'গোল্ড ডিগার'।

আচ্ছা, আপনি আমি গোল্ড ডিগার না? আপনার জন্য বিয়েত প্রস্তাব আসলে, অথবা আপনার মেয়ের জন্য, বোনের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসলে সবচেয়ে আগে কী জানতে চান? পাত্রের ইনকাম কত? পেশা কী? সরকারি চাকরি? লুফে নাও! বিদেশে থাকে? কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। ছেলের বাবার অনেক ব্যাংক ব্যালেন্স, বাড়ি-গাড়ি? কেল্লা ফতে, বড় মাছ ধরা গেছে।

এইসব লোভ না? গোল্ড ডিগিং না? নিজের বোনের বিয়ের দেনমোহর কত চান? পাত্রপক্ষ বলছে দশলাখ, আপনারা চান বিশলাখ। নাহ, হবে না। আরও বেশি দামে মেয়েকে দিবো। এটা তো তার ভালোর জন্যই করছি।

মেয়ে প্রেম করে, প্রেমিক এখনও প্রতিষ্ঠিত না। বাপের তেমন টাকাপয়সা নেই, ছেলেরও তেমন আহামরি চাকরির সম্ভাবনা নেই, তারউপর সমবয়সী। নাহ, এখানে মেয়ে ভালো থাকবে না। অন্য ছেলে খুঁজো, বয়সে বড়, প্রতিষ্ঠিত, ভালো কামাই করে, গাড়ি-বাড়ি আছে নিজের। তাহলে মেয়েটার একটা গতি করা গেলো।

আপনারা আজকে যারা মৃত মুনিয়ার বিচারে বসছেন, মেয়েটাকে লোভী বলছেন, আপনাদের নিজেদের ঘরেই এসব হচ্ছে না? তখন মনে থাকে না যে, অত টাকার খাই ভালো না? নিজের বেলায় আঁটিশুঁটি, পরের বেলায় দাঁতকপাটি???

মেয়েটা ভুল পথে গিয়েছিলো। কিন্তু তাকে গাইড করার জন্য, সঠিক পথ চেনানোর জন্য কে ছিল? আপনি ছিলেন? মেয়েটা জীবিত থাকতে তো আপনারাই ওকে দেখে মুখ ফিরায়ে, বাঁকা হাসি দিয়েছেন। শিল্পপতির বান্ধবী হিসাবে আপনারাই যথেষ্ট খাতিরযত্ন করেছেন। এখন আবার চোখ উল্টান কেন?

সত্যি করে বলেন তো, আপনাদের পরিচিত পুরুষ বন্ধু বা কলিগ যাদের এরকম বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক আছে, তারা কয়জন যান লোকটাকে বুঝাতে যে, এভাবে মেয়েটাকে ব্যবহার করা ঠিক হচ্ছে না? হয় সে তাকে মুক্ত করে দিক, অথবা যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়ে সমাজের সামনে আনুক।

একজনও না। আপনাদের মধ্যে একজনেরও সেই ইচ্ছা নেই। আপনারা শুধু পপকর্ণ হাতে নিয়ে তামাশা দেখার দর্শক। আপনারা কেউ নিজের ক্ষমতাশালী বন্ধু/কলিগ এর বিরাগভাজন হতে চাইবেন না, বরং উল্টা তাল দিবেন। আর মেয়েটা মরলে, তাকে সোজাসুজি 'রক্ষিতা' বলে গাল দিবেন।

আরে, আসল রক্ষিতা তো আপনারা। মুনিয়া তো ছিলো ভাত-কাপড়-পড়াশোনার জন্য। আপনারা কীজন্য পাশে থাকেন? শিল্পপতি বন্ধুর সাতখুন মাফ করে দেন? আপনাদের অন্যায়কে অন্যায় বলতে সমস্যা কোথায়? আসলে আপনারাও বিক্রি হয়ে গেছেন। কেউ ক্ষমতাশালী বন্ধুর সাথে ব্যবসার নতুন চুক্তি করতে, কেউ তার ও তার ক্ষমতাসীন পরিবারের সাথে কেবল ভালো সম্পর্ক রাখতে। আসল রক্ষিতা বা বেশ্যা বলে কেউ থাকলে সেটা আপনারা।

মুনিয়া মেয়েটার দায়িত্ব নিতে কতজন আগায়ে আসছেন? আচ্ছা আপনাদের কথা বাদ। মুনিয়ার খাওয়া-পরা-নিরাপত্তার দায় এই রাষ্ট্রের না? কতজন ওর সেই অসহায় অবস্থায় ওকে একটা সমাধান দেখিয়েছেন?

একজনও না। আমি বাজী ধরে বলতে পারি। কারণ আমার সময়ে কেউ আসে নাই। আর মুনিয়া তো অসহায়ের থেকেও অসহায়, তার উপকার করতে যাবেন আপনি কোন স্বার্থে?
মুনিয়া সত্যি সত্যি গোল্ড ডিগার হলে, আনভীর মুখ ফিরায়ে নেওয়ার পরেরদিন সে অন্য পুরুষের কাছে যেতো। ফোনে এভাবে কাকুতিমিনতি করে কাঁদতো না। ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না। মুনিয়ার যা বয়স ছিলো, এবং যা শরীর-সৌন্দর্য ছিলো, তাতে সে অনায়াসে আরও পাঁচটা আনভীরকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাতে পারতো। যে কাউকে বিয়ে করে সংসারী হয়ে যেতে পারতো।

সেটা না করে সে মৃত্যু বেছে নিয়েছে কেন জানেন? কারণ সে সত্যি বিশ্বাস করতো যে, আনভীর তাকে একদিন বিয়ে করবে। ফোনে "খানকীর বাচ্চা খানকী" শুনে তার সমস্ত স্বপ্ন ভেঙেচুড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিলো।

রিপোর্টার, দৈনিক তরুণ কন্ঠ

# লেখকের নিজস্ব মতামত। এর জন্য কোনভাবেই সময়নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top