বৃহস্পতিবার, ১২ই মার্চ ২০২৬, ২৮শে ফাল্গুন ১৪৩২


কেমন বইমেলা চাই আমরা?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:১২ মার্চ ২০২৬, ১১:০১

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

বইমেলার ধারণা আমাদের কাছে কেমন? আসলে কেমন বইমেলা দেখতে চাই আমরা? অথবা কেমন হওয়া উচিৎ বইমেলা? মেলা বলতে আমরা বুঝে ফেলতে চাই একটি বড় জায়গায় নানা ধরনের পণ্যের প্রদর্শনী ও কেনাবেচার ব্যবস্থা। সে অর্থে কাগজ, রঙ, কালি, উৎপাদনে ব্যয় হওয়া কিছু মানুষের শ্রম—সব মিলিয়ে সাধারণ অর্থ দাঁড়ায় বইও একটি উৎপাদিত পণ্য। কিন্তু বইকে আমরা থালা, বাটি, জুতা, জামার মতো সংসারের আর দশটা প্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ভাবি না।

বই মানুষের চিন্তা, দর্শন আর সৃজনশীলতার সহজপাঠ। বই আরও অনেক গভীর জ্ঞানের সংঘবদ্ধ একটি শক্তি। মাঝে মাঝে ভাবি, একটি বইয়ের দুই মলাটের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে পাঠক অসংখ্য লাইনে জড়িয়ে থাকা কালো রঙের শিরার ভেতর দিয়ে চিন্তার প্রতি একটি দায়বোধ তৈরি করে নিতে সমর্থ হয়ে ওঠেন?

এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই দায়বোধ কার প্রতি? নিজস্ব আত্মার প্রতি, সমষ্টির ভাবনার প্রতি? বই আসলে মানুষের চিন্তাকে উসকে দেয়। পাঠককে প্রস্তুত করে উপলব্ধির এক নতুন পৃথিবীর মুখোমুখি হতে।

পৃথিবী জুড়ে প্রতিনিয়ত অজস্র বই প্রকাশিত হয়। বইয়ের পাঠক সেই বই কখনো হাতে তুলে নেন আবারও নেনও না। একজন ব্যক্তি পাঠক হিসেবে আমার আনুগত্য থাকে প্রকাশিত অসংখ্য বইয়ের ভেতর থেকে একটি উপল খণ্ড বেছে বের করার দিকে যা আমার নিজস্ব চেতনাকে সমর্থন করে। এই কথার সাদা অর্থ হচ্ছে, নিজের পাঠক আত্মার চাহিদা মেটাতে একটি ভালো বই খুঁজে নেওয়া।

যতদূর মনে পড়ে লুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কোনো এক বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘কেমন বইমেলা চাই?’ এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। বহু পাঠক মতামত দিয়েছিলেন। তাদের চাওয়া-পাওয়ার সাময়িক প্রতিক্রিয়ার চিত্র পাওয়া গিয়েছিল সেই প্রতিবেদনে।

তারা কেউ বইমেলার সময়সীমা বাড়ানোর কথা বলেছিলেন, কেউ মেলার পরিবেশের আরও উন্নতির দাবি জানিয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় বই প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি উপন্যাস, প্রবন্ধ, ইতিহাস বিষয়ক এবং পাঠ সহযোগী গ্রন্থ প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে সবই ছিল বইমেলায় আগত পাঠকদের সাময়িক প্রতিক্রিয়া। তারা তাদের মতো করে ভাবনাগুলো প্রকাশ করেছিলেন। সাময়িক শব্দটি প্রয়োগের কারণ হলো, বইমেলার কাছে যে যার চাহিদার কথাই সেদিন প্রতিবেদকের কাছে জানিয়েছিলেন। তারপর যথানিয়মে সেবারের ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ শেষ হয়েছিল।

পরের বছর আবার বইমেলার আয়োজন করা হয়েছিল। প্রকাশকরা প্রচুর বই প্রকাশ করেছিলেন পরের বছরেও। বহু পাঠকের অথবা দর্শনার্থীর আগমন ঘটেছিল মেলায়। লেখকদের মধ্যে কেউ কেউ তৃপ্তি নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে নিজস্ব ভাষার স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেওয়ার ঘটনার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আয়োজিত বইমেলার এই ছবিই আমাদের সবার কাছে পরিচিত। কিন্তু আজও আমার কাছে প্রশ্নটা থেকেই গেল, ভাষার মাসে বইয়ের উৎসব পাঠককে কতদূর বহন করে নিয়ে যেতে সক্ষম হলো অথবা হয়েছে?

১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান অমর একুশে গ্রন্থমেলার যাত্রা শুরুর ইতিহাস সবারই যানা। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে এর সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ১৯৮৪ সালে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নামে এটি মাসব্যাপী আয়োজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর থেকে এই গ্রন্থমেলাকে উপলক্ষ করে অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়ে আসছে।

অসংখ্য পাঠক অথবা দর্শকের আগমন ঘটছে। তাদের একাংশ বই কিনেছেন। অন্যরা হয়তো ঘুরেফিরে বই দেখে ঘরে ফিরে গেছেন। অনেক বছর ধরে প্রচুর লেখকের আগমন ঘটেছে মেলায়। অনেকে বলেন, পাঠক ও লেখকের সম্মিলন ঘটিয়েছে এই মেলা।

আবার কারও ভাষায়, এই মেলা বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পরিচয় নিয়ে বিকশিত হয়েছে। বহু বছর থেকে এই মেলায় নিয়মিত উপস্থিত থেকে আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে প্রকৃতার্থে তথাকথিত বইয়ের এই উৎসবে পাঠকের সংখ্যা কমেছে ধীরে ধীরে।

অনেকে স্বীকার করতে চাইবেন না। কেউ পরম বিস্ময়ে প্রশ্ন তুলবেন, বইমেলায় পাঠকের সংখ্যা আবার কমে যায় কীভাবে? বইয়ের পাঠকদের জন্যই তো এই মেলার আয়োজন! কিন্তু ক্রমশ একটি নির্দিষ্ট ছকে আটকা পড়ে গিয়ে এই বইমেলা পাঠক আকর্ষণ ঘটাতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে হয়। তবে এই মতামত একান্তই আমার ব্যক্তিগত।

একুশের গ্রন্থমেলা একটি ছকে আবদ্ধ হয়ে যাওয়াকে এক ধরনের গতানুগতিকতা বলা যেতে পারে।  প্রতি বছর মেলায় নতুন বই নিয়ে আত্মপ্রকাশ করছেন নতুন লেখক। কোনো না কোনো প্রকাশক তাদের বই প্রকাশ করছেন। সেসব বই বিক্রিও হচ্ছে।

সত্যি কথা বলতে কী, লেখকের পরিচিতরা এক ধরনের দায়বদ্ধতা থেকে তা কিনে নিচ্ছেন। আবার পরিচিত নয় এমন কৌতূহলী পাঠকও তাদের বই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন প্রকাশনা সংস্থার স্টল থেকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এদের মধ্যে সবাই কি বইমনস্ক হয়ে উঠছে? একটি বইমেলা কি শুধু প্রকাশিত বইয়ের প্রদর্শনী আর বিক্রির জায়গা?

বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলার কলেবর ক্রমশ বড় হয়েছে। এই মেলা একাডেমি ভবনের ছোট পরিসর থেকে উঠে গিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল মাঠে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু ঝলমলে বইমেলা পাঠের আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে, চাহিদা অনুযায়ী বই সরবরাহ করতে কতটা কার্যকর হয়ে উঠতে পেরেছে তা নিয়ে মনে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

শুধুই কি বছরে একবার আলো জ্বেলে প্রকাশকদের এক জায়গায় জড়ো হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে, বই পাঠের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক উদ্ধৃতিতে পথঘাট সাজিয়ে বইয়ের সত্যিকার পাঠক তৈরির চেষ্টা সম্পূর্ণ হয়ে যায়? সংগঠিত করা যায় একটি দেশের সংস্কৃতি চর্চাকে?

এই বইমেলাকে আয়োজকরা কতদূর ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন? বছর জুড়ে ধারাবাহিকভাবে কতগুলো বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে কি? আমরা শিশুদের কাছে সৃজনশীল বই পৌঁছে দেওয়ার ভাবনাটাকে শ্লোগানের পর্যায়েই আটকে রেখেছি। কিন্তু মাঠে-প্রান্তরে শিশুদের মধ্যে বই আন্দোলনের বিস্তার ঘটানো কতদূর সম্ভব হয়েছে তা অজানাই রয়ে গেছে আমাদের কাছে।

এই কাজগুলো শুধু একা বাংলা একাডেমির দায়িত্ব নয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন সরকারগুলোও এই বিষয়গুলো নিয়ে কার্যকরভাবে চিন্তা ভাবনা করেনি। কেউ কোনো পরিকল্পনাও তৈরি করেনি। ফলে বছরের একটি মাসে বইমেলার বৃহৎ আয়োজন প্রকৃত অর্থে কোনো লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি বলেই ধারণা জন্মে।

এখানে মেলায় প্রকাশিত বইয়ের মান নিয়ে আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। বইমেলায় যে ধরনের বই পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে এবং তা কেনার জন্য প্রলুব্ধ করা হচ্ছে তার মধ্যে কয়টি বই মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ?

একটা সময় ছিল যখন বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের মান নিয়ে আমাদের মাথায় এই প্রশ্নের উদয় হয়নি। কেন হয়নি? কারণ তখনো বইকেও উৎপাদিত একটি সাধারণ পণ্যের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে বাজারে বিক্রি করার প্রবণতা জন্ম নেয়নি। এই কথাটা অনেকের কাছেই মেনে নেওয়া কঠিন হবে।

কেউ প্রশ্ন করবেন, শত ফুল ফুটতে দিলে সমস্যা কোথায়? মেলায় গিয়ে ভালোমন্দের ভিড়ে পাঠকই এই প্রশ্নের সমাধান করবেন। কিন্তু বাস্তবে কি তাই ঘটছে? বিপণন কৌশল কি মানসম্পন্ন বইয়ের পাশাপাশি মানহীন বই পাঠককে হাতে তুলতে বাধ্য করছে না?

জনরুচি সবসময় সঠিক পথে প্রবাহিত হয় এমন দিব্যি কেউ কোনোদিন দিতে পারে না। তাই এই রুচি তৈরি করে দেওয়া অথবা তৈরির চেষ্টা করার প্রশ্নটি গুরুত্ববহ আমার কাছে। অনেকে এখানে রুচি তৈরির কথায় স্বৈরতান্ত্রিক ভাবনার অনুপ্রবেশ ঘটছে বলে অভিযোগ তুলতে পারেন। নির্দেশনা দিয়ে জনরুচি তৈরি করা তো এক ধরনের রেজিমেন্টেড ধারণা। সে বিতর্কে জড়াতে চাই না।

কারণ প্রসঙ্গটির সঙ্গে সমষ্টির মানসিক উন্নয়নের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। পাঠকের রুচি, পাঠকের সুচিন্তিত দৃষ্টি তৈরি করার দায়িত্ব বলে একটি বিষয় এখনো প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করি। এই দায়িত্ব যেমন প্রকাশকের কাছে আছে তেমনি আছে লেখকের কাছেও।

একটি বইমেলা সাংস্কৃতিক আন্দোলন আর তার ভবিষ্যৎ যাত্রাপথকেও নির্মাণ করে। এই দায়িত্ব গুরুতর। তাই সাহিত্য ও শিল্পের সঞ্চারের জন্য হাটবাজারের বিপণনের অতিশায়ী একটি বিকল্প অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার কথা অনেকে ভাবছেন এখন। এই বিকল্পের সন্ধানে আমাদের আরও আগে হয়তো উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন ছিল।

শুধু ফেব্রুয়ারি মাসে একটি বৃহৎ বইমেলার আয়োজন করে সেই গুরুতর দায়িত্ব সম্পাদন করার কাজটি সফল করা যাবে না বলেই মনে হয়। আমরা আসলে কেমন বইমেলা চাই, কোনো ধরনের বিকল্প বইমেলার সন্ধান আমরা করবো ভবিষ্যতে এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য পাঠকের কাছেই ফিরে যেতে হবে।  

ইরাজ আহমেদ : কবি

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়