শুক্রবার, ১লা মে ২০২৬, ১৮ই বৈশাখ ১৪৩৩


বুদ্ধ পূর্ণিমা ২০২৬: রক্তাক্ত পৃথিবীতে বুদ্ধ কি তবে কেবলই পাথরের মূর্তি?

প্রকাশিত:১ মে ২০২৬, ২১:৫৪

ছবি: লেখকের ছবি

ছবি: লেখকের ছবি

আড়াই হাজার বছরেরও আগে এক বৈশাখী পূর্ণিমার চাঁদ যখন কপিলাবস্তুর শালবনে হিরন্ময় দ্যুতি ছড়াচ্ছিল, তখন এক রাজপুত্র জন্মেছিলেন— যিনি সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেও মানুষের জরা, ব্যাধি আর মৃত্যুর মিছিলে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। আজ পহেলা মে, ২০২৬। সেই একই চাঁদ উঠেছে, কিন্তু পৃথিবীটা বদলে গেছে। আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা কেবল মোমবাতি জ্বালানোর উৎসব নয়, বরং এক রক্তাক্ত গ্রহে দাঁড়িয়ে মানুষের বিপন্ন অস্তিত্ব রক্ষার এক নির্মোহ আয়না।

সম্প্রতি লুম্বিনির সেই পবিত্র মাটি ছুঁয়ে আসা জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কণ্ঠে যে হাহাকার শোনা গেছে, তা কেবল কূটনৈতিক বার্তা নয়। মহাসচিবের ভাষ্যে, ‘‘বর্তমান বিশ্ব যখন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা আর পারমাণবিক ছায়ায় কাঁপছে, তখন বুদ্ধের অহিংসাই হতে পারে একমাত্র রক্ষা কবচ।’’ মহাসচিবের এই উপলব্ধি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের উদ্ভাবিত বিধ্বংসী অস্ত্রের চেয়ে বুদ্ধের ‘মৈত্রী’ অনেক বেশি শক্তিশালী। মনীষী প্লেটো যেমন বলেছিলেন, ‘‘কেবল মৃতরাই যুদ্ধের শেষ দেখেছে,’’ বুদ্ধ সেই মৃত্যুর মিছিল থামাতে শিখিয়েছিলেন কাম-ক্রোধ-লোভ জয়ের মন্ত্র।

কিন্তু আজ আমাদের বৌদ্ধ বিহারগুলোর দিকে তাকালে এক গভীর শূন্যতা হাহাকার করে ওঠে। যে বুদ্ধ রাজকীয় বিলাসিতা ত্যাগ করে গাছের নিচে ধ্যানমগ্ন হয়েছিলেন, আজ আমরা তাকেই সাজাচ্ছি কোটি টাকার স্বর্ণালঙ্কারে। আমরা কি বুদ্ধকে পূজা করছি, নাকি আমাদের নিজেদের সামর্থ্যের আস্ফালন দেখাচ্ছি? আমরা যেভাবে বুদ্ধকে পূজা করছি এই পূজা দিয়ে কি বুদ্ধকে সত্যিই পূজি‍ঁত হচ্ছেন?
বিহারে থালার পর থালা খাবারের স্তূপ, কান ফাটানো ঢাক-ঢোলের শব্দ আর রঙের বাহার কি সত্যিই বুদ্ধের পথ? ‘‘তথাগতের ধম্ম তো শীলপালন আর করুণার মার্গ, তলোয়ারের ধারের ওপর দিয়ে হাঁটার মতো কঠিন এক যাত্রা।’’ আমরা আজ শ্বেতশুভ্র মৌনতার পরিবর্তে কোলাহলে মুক্তি খুঁজছি। অথচ লিও তলস্তয় বলেছিলেন, ‘‘প্রকৃত সুখ বাইরে নয়, আমাদের ভেতরেই লুকিয়ে আছে।’’ সেই ভেতরের সুখকে কি আমরা বিলাসিতার আড়ালে চাপা দিয়ে দিচ্ছি না?

এক বিচিত্র দ্বিচারিতার মধ্য দিয়ে কাটছে আমাদের সময়। বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনেও অনেক বৌদ্ধ ঘরে মাছ-মাংসের আয়োজনে ব্যস্ত। অথচ বুদ্ধের শিক্ষা ছিল—প্রতিটি জীবের প্রতি মৈত্রী। পাশ্চাত্যের অনেক বৌদ্ধ আজ প্রাণিজ খাদ্য ত্যাগ করে যে সংবেদনশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন, আমরা বঙ্গীয়রা কেন সেখানে পিছিয়ে? যেখানে পুকুরে মাছ অবমুক্ত করা কেবলই ‘ফেসবুক লাইভ’ বা লোকদেখানো অভিনয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে মনের গভীরে 'অহিংসা'র বীজ বপন করা আজ বড্ড জরুরি। কিছু বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আছে শুধু ফেসবুক সামাজিক মাধ্যমে লাইভ করা এবং ঘুরে বেড়ানো আর মানুষ থেকে দান চাওয়ার মধ্যে।মনে রাখতে হবে বুদ্ধের সেই অমর বাণী— ‘‘ঘৃণা দিয়ে কখনও ঘৃণা মেটে না, মৈত্রী দিয়েই কেবল ঘৃণাকে জয় করা সম্ভব।’’ বৌদ্ধ ভিক্ষুরা যে কারণে প্রবজ্যা নেয় সংসার ত্যাগ করে সেই উদ্দেশ্য কি তারা সফল করতে পেরেছেন?তাহলে তারা যেখানে সফলতা পাননি, তারা আমাদেরকে কি শিক্ষা দেবেন? বর্তমানে বেশিরভাগ বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বুদ্ধের মূল ধর্ম থেকে, মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে গেছে এবং তাদের মতো আমরা সাধারণ মানুষেরাও ছুটে চলেছি অধর্মের দিকে। আজকে বেশিরভাগ বৌদ্ধ ভিক্ষুরা স্মৃতি ভাবনায় নেই, স্রোতাপন্ন হতে পারেননি, তারা নিজেরাই প্রমাদ হয়ে আমাদেরকে অপ্রমাদ শিক্ষা দিচ্ছেন। অর্থবিত্ত লাভ এবং সৎকার নিয়ে এখন আমরা সবাই ব্যতিব্যস্ত। ধর্মরাজ গৌতম বুদ্ধের মূল মেসেজ কি ছিল তা আমাদেরকে অনুধাবন করতে হবে, আবারো নতুন করে ভাবতে হবে,জাগতে হবে বৌদ্ধ সমাজকে।

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ দেশ অতীশ দীপঙ্করের, এ দেশ শান্তির। বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার—‘‘ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার’’— এই দর্শনই বুদ্ধের সাম্যের বাণীর প্রতিধ্বনি। কিন্তু শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাই যথেষ্ট নয়, আমাদের প্রয়োজন হৃদয়ের নিরাপত্তা।

আসুন, ২০২৬ সালের এই বুদ্ধ পূর্ণিমায় আমরা শুধু মঞ্চ বানিয়ে নাচ-গান না করি। আসুন বিলাসী আয়োজন ছেঁটে ফেলে সেই অর্থ হাসপাতালের মুমূর্ষু রোগী আর অনাথ শিশুদের জন্য উৎসর্গ করি।

বিহারে যাওয়ার সময় কোলাহল নয়, বরং শ্বেতশুভ্র পোশাকে মৌন হয়ে মানবতার প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে হাঁটি।
জিহ্বার লালসা সংবরণ করে অন্তত একটি দিন নিরামিষ আহারে অভ্যস্ত হই।

বুদ্ধের কাছে কোনো অলৌকিকতার জায়গা ছিল না। তিনি জানতেন, মানুষ নিজেই নিজের ত্রাণকর্তা। আজকের এই অস্থির সময়ে আমাদের স্লোগান হোক— ‘‘অত্ত দীপো ভব’’ (নিজের প্রদীপ নিজেই হও)।

বাংলাদেশের পবিত্র প্রতিটি বৌদ্ধবিহার থেকে শুরু করে লুম্বিনি পর্যন্ত যে শান্তির বার্তা আজ অনুরণিত হচ্ছে, তা যেন কেবল একদিনের 'ছদ্মবেশ' না হয়। আমরা যদি সত্যিকার ভাবে বুদ্ধকে পূজা করতে চাই তাহলে বুদ্ধমতে সৎ গুরুর সন্ধান করতে হবে এবং সঠিক ও সত্য আর্যপুদগলের সন্ধান লাভ করে সঠিক বিদর্শন ভাবনা আচরণ করলেই মহামতি বুদ্ধ সত্যিকার ভাবে পূজিত হবেন, আর এটাই হবে সঠিক বুদ্ধ পূজা।

শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। শান্তি আসুক আমাদের তপ্ত হৃদয়ে।

লেখক পরিচিতি: সাংবাদিক,প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, এক্স ভাইস চেয়ারম্যান (কোরিয়া-বাংলা প্রেসক্লাব)

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়