শনিবার, ২৫শে এপ্রিল ২০২৬, ১২ই বৈশাখ ১৪৩৩
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের জাতীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি : সংগৃহীত
জুলাই আবার ফিরে আসবে, তখন চূড়ান্তভাবে ফ্যাসিবাদ বিদায় হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ জন্য তিনি দেশবাসী মাঠে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘সেই লড়াইয়ে জনগণের বিজয় হবে। আমরা সামনের সারিতে থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যাবো। জনতার বিজয় হবে। আমরা আশাবাদী, এ বাংলাদেশ পাল্টাবে। এই যুদ্ধ সংসদে এবং রাজপথে চলমান থাকবে। আমরা দেশবাসীকে মাঠে চাই। ব্যক্তিগত কোনো দাবি দাওয়া আমাদের নেই। সব দাবি দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে।’
শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের জাতীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিক বলেন, ‘মহান জাতীয় সংসদে সরকারি দল মুখে ঠিকই জুলাইয়ের কথা বলেন, শহীদ হাদির কথাও বলেন; কিন্তু কার্যত আমরা সরকারি দলের কাছ থেকে তার উল্টোটা দেখতে পাই। তারা দুটি ভোটের একটা ৫১ শতাংশ মানেন, যা তাদের নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে। কিন্তু আরেকটি গণভোটের ৭০ শতাংশ মানেন না- যা শাসকগোষ্ঠীকে স্বৈরতন্ত্র হওয়া থেকে রক্ষা করবে, জাতিকে বৈষম্যমুক্ত করবে, সুশাসন কায়েম করবে এবং সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ জনগণকে দিতে পারবে। তাদের এই দ্বিচারিতা জাতির জন্য লজ্জার, দুঃখের। যেদিন ৭০ শতাংশ ভোটের রায় মানবে, সেদিন বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি প্রত্যেকটি বিষয়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী পথ অনুসরণ করে যাচ্ছে, যে আওয়ামী লীগ জাতি ও বিরোধী দলকে নিয়ে ব্যঙ্গ করত এবং লাঠিয়াল দিয়ে কর্তৃত্ববাদ কায়েম করেছিল। বর্তমানে আফসোসের ব্যাপার হলো, রাষ্ট্রের যেখানে যেখানে সংস্কার দরকার, তার প্রত্যেকটি বিষয়ে বিরোধিতা করছে বিএনপি। এটি জাতির সঙ্গে সুস্পষ্ট প্রতারণা।’
বিএনপিকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘দেশে জুলাই না হলে এই রাজনীতি থাকতো না। আমাদের ভাইবোনদের স্বামী-সন্তানরা জীবন না দিলে ক্ষমতায় বসতে পারতেন না আপনারা। শহীদ পরিবাররা যখন কান্না করছিলেন, তখন তাদের পাশে যাওয়ার সময় ছিল না বিএনপির। তখন তারা নির্বাচন চেয়েছিল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘সেদিন আপামর ছাত্রসমাজ রাস্তায় নেমে এসেছিল। সবাই মাস্টারমাইন্ড। প্রত্যেক ব্যক্তি ও পরিবারের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। আমরা কী পারছি, আর পারিনি, তার জবাবদিহিতিা আছে।’
তিনি বলেন, ‘যে আইন বাস্তবায়ন হলে, অধ্যাদেশ পাস করলে রাষ্ট্র সংস্কার হবে- সেগুলো বিএনপি বাতিল করে দিচ্ছে। তারা গণভোটের রায় অস্বীকার করার মধ্যদিয়ে ফ্যাসিবাদের পথে যাত্রা শুরু করেছে।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এমপি মাসুম মোস্তফার উপর হামলা করা হয়েছে। শাহবাগ থানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর হামলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসীদের ক্রিস প্রদর্শনী- এমন বাংলাদেশ জুলাই যোদ্ধারা চায়নি। এমন বাংলাদেশ আমরা চাই না। আমরা পরিবর্তনের বাংলাদেশ চাই। মা-বোনেরা নিরাপত্তার সঙ্গে বের হবে এবং কাজ শেষে নিরাত্তার সঙ্গে ফিরবে।’
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল দেশবাসী। ফলে সংস্কার কমিশন গঠিত হয়। কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা দিয়েছে বিএনপি। সবশেষে গণভোটে রাজি হলেও নির্বাচনের পর পরই গণভোটের রায়কে অস্বীকার করছে। প্রকৃতপক্ষে বিএনপি তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে। মাত্র দুই মাস বয়সে আর কোনো সরকার এত অজনপ্রিয় হয়নি, যা হয়েছে বিএনপি সরকারের। আমরা জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান আদায়ে রাজপথ ও সংসদে আছি। আমরা জনতার দাবি আদায় করে ছাড়ব।’
এলডিপির চেয়াম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় দেশের প্রকৃত অবস্থা তারেক রহমান জানতেন না। তাকে যা বলা হচ্ছে, তাই শুনছেন। জনগণ কৃষক কার্ড চায় না, ফ্যামিলি কার্ড চায় না।’
তিনি বলেন, ‘সামনে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা রয়েছে, অর্থনীতিকে সামাল দেওয়া যাবে না। যার প্রভাব জনগণের উপর পড়বে। চাঁদাবাজিতে লিপ্ত বিএনপির লোকেরা।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে কর্নেল অলি বলেন, ‘আপনাকে ঘিরে রেখেছে, বেষ্টনী থেকে বের হন।’ বিরোধী দলীয় নেতার সঙ্গে বসে জাতিকে মুক্তি দিতে সেই পলিসি নির্ধারণেরও পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘জনগণের ৭০ শতাংশ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ তে রায় দিয়েছে। কিন্তু তলে তলে বিএনপি ‘না’-এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছে। বিএনপি মোনাফিকি করে দ্বিচারিতা করে একবার পার পেয়েছে। ভবিষ্যতে জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে তাদের। সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশনের মাধ্যমে জুলাই সনদের অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন চায় জনগণ।’
জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন হয়েছিল নতুন বাংলাদেশ গড়তে, আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত করতে। আজ সেই আন্দোলনকে অস্বীকার করা হচ্ছে। আজকে দুমাসের মাথায় রাজপথে নামতে হচ্ছে। এটি কারও জন্য সুখকর হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাইয়ে দেশ আবার স্বাধীন হয়েছে। আজকে আবার এক ব্যক্তির শাসনের দিকে নিতে চায় বিএনপি। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ তা মেনে নেবে না।’
সরকার যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে, তাহলে ১১ দল আন্দোলনের ডাক দিলে প্রথম কাতারে থেকে প্রথম শহীদ হওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এটিএম আজহার।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সরকার জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আবার দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলব। যেসব সাংবিধানিক কাঠামো ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার জন্য দায়ী, তার প্রত্যেকটি সংস্কারের জন্য যে প্রস্তাবনা, তাতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিএনপি।’
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘বর্তমান সরকার মানবাধিকার কমিশন, গুম সংক্রান্ত কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় অধ্যাদেশ ও গণভোট মানে না। গায়ের জোরে তারা এসব বাতিল করে দিয়েছে। বাংলাদেশে কোনো ফ্যাসিবাদী সরকার টিকতে পারেনি। জুলাই শহীদ পরিবার, জুলাই আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী ও জুলাইযোদ্ধারা আজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে।’
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘গণভোটের পর জুলাই সনদ বাস্তবায়ের দাবি নিয়ে আবার সমাবেশ করতে হবে, তা জুলাই যোদ্ধারা চিন্তা করেনি। সংসদের প্রথম অধিবেশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। জুলাই শহীদ পরিবার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বক্তব্য শুনতে চায় না, বরং সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন কবে ডাকবেন- তা শুনতে চায়। আমরা ১১ দল ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের দাবি আদায় করেই ছাড়ব।’
ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, যা‘রা ফ্যাসিবাদকে পুনর্বাসন করছেন, তাদের পরিণতি পলাতক আওয়ামী লীগের মতোই হবে। সরকার যে মসনদে বসে আছে- সেই মসনদ জুলাই যোদ্ধাদের রক্তের মসনদ। জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে গাদ্দারি করে তাদের পা ভাঙতে এলে আপনাদের পা ভেঙে যাবে।’
তিনি আহ্বান জানান, জুলাইযোদ্ধারা আজ শাহবাগে একত্রিত হয়ে যে আওয়াজ তুলেছে, সেই আওয়াজকে বোঝার চেষ্টা করুন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করুন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাগপা সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান, বিডিপির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির মুখলেসুর রহমান কাসেমি, খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের আমির সেলিম উদ্দিন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও বাংলাদেশ লইয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি অ্যাডভোকেট জসিম, জুলাইয়ের শিশু শহীদ জাবির ইবরাহিমের মা রোকেয়া বেগম, জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম ও জাকসুর জিএস মাজহরুল ইসলাম।
সমাবেশের উদ্বোধনীতে বক্তব্য দেন জুলাই যোদ্ধা কামরুল হাসান। সমাবেশে জুলাই শহীদ পরিবার, আহত পঙ্গুত্ববরণকারী এবং জুলাই যোদ্ধাদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন- জুলাই শহীদ যুবায়ের খানের পিতা অ্যাডভোকেট শহিদুল ইসলাম খান, শহীদ আনাস ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম খান, হাত হারানো জুলাই যোদ্ধা তৌহিদ ফারাজী, জুলাই শহীদের পিতা জাকির হোসেন, শহীদের পিতা শেখ জামাল হোসাইন, শহীদের পিতা গাজিউর রহমান ও হাত হারানো জুলাই যোদ্ধা আতিউর ইসলাম প্রমুখ।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ইয়াছিন আরাফাত।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)